ইকুরিয়া বিআরটিএ এডি মামুন ও পরিদর্শক নজরুলের বিরুদ্ধে ঘুষ–কারসাজির গুরুতর অভিযোগ

স্টাফ রিপোর্টার:

ঢাকার কেরানীগঞ্জে অবস্থিত বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)–এর ইকুরিয়া কার্যালয় এখন সাধারণ সেবা প্রত্যাশীদের কাছে এক আতঙ্কের নাম—এমনটাই অভিযোগ ভুক্তভোগী, স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন মহলের। ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষা, যানবাহনের ফিটনেস সনদ, রেজিস্ট্রেশন, নামজারি, মালিকানা হস্তান্তর—প্রায় প্রতিটি সেবাতেই নিয়মের বদলে দালাল ও ঘুষনির্ভর প্রক্রিয়া কার্যত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট পুরো কার্যালয়ের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছে, ফলে নির্ধারিত সরকারি ফি জমা দিয়ে নিয়ম মেনে আবেদন করলেও কাজ শেষ করতে হলে অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হচ্ছে।

লাইসেন্স পরীক্ষায় ‘নিয়ম’ নয়, ‘যোগাযোগ’ই নাকি মূল চাবিকাঠি

সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে ও একাধিক ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ড্রাইভিং লাইসেন্সের তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক—দুই পরীক্ষাই এখানে প্রশ্নবিদ্ধ। অভিযোগ রয়েছে, নিয়ম মেনে আবেদন, নির্ধারিত দিনে উপস্থিতি, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা—সবকিছু ঠিকঠাক করেও অনেক প্রার্থীকে পরিকল্পিতভাবে ফেল দেখানো হয়। একাধিক পরীক্ষার্থী জানান, দক্ষতার সঙ্গে গাড়ি চালিয়েও তারা অকৃতকার্য হয়েছেন; কিন্তু একই দিনে দালালের মাধ্যমে আসা প্রার্থীরা ন্যূনতম দক্ষতা না দেখিয়েও উত্তীর্ণ হয়েছেন।

ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, পরীক্ষার মাঠে দক্ষতা প্রদর্শনের চেয়ে আগে প্রয়োজন দালালের সঙ্গে যোগাযোগ। নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দালালের হাতে তুলে দিলে পরীক্ষা না দিয়েও পাশ করিয়ে দেওয়ার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়—এমন অভিযোগও রয়েছে। কেউ কেউ দাবি করেন, পরীক্ষার দিন উপস্থিত না থেকেও ‘পাস’ দেখানো হয়েছে—যা গুরুতর অনিয়মের ইঙ্গিত দেয়।

দালালবিরোধী ব্যানারে ছবি, অথচ অফিসেই অবাধ যাতায়াত

কার্যালয়ের ভেতর ও বাইরে দালালদের বিষয়ে সতর্কীকরণ ব্যানার টানানো থাকলেও অভিযোগ, যাদের ছবি দিয়ে সতর্ক করা হয়েছে, তাদের কয়েকজনই নিয়মিত অফিস চত্বরে ঘোরাফেরা করছেন। স্থানীয়দের দাবি, এদের কেউ কেউ অতীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হয়েছিলেন এবং বিআরটিএর নিজস্ব তালিকায় ‘কালো তালিকাভুক্ত’ ছিলেন। তবুও তারা আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। কীভাবে তারা পুনরায় প্রভাব বিস্তার করলেন—সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে সংশ্লিষ্টরা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সূত্রের দাবি, কার্যালয়ের ভেতরে-বাইরে এই দালালরা প্রকাশ্যে সেবা প্রত্যাশীদের ‘সহায়তা’র প্রস্তাব দেন। কেউ সরাসরি নিয়ম মেনে কাজ করতে চাইলে তার ফাইল নানাভাবে আটকে দেওয়া, অপ্রয়োজনীয় কাগজপত্র চাওয়া, বা পরীক্ষায় ফেল দেখানোর মতো অভিযোগ রয়েছে। ফলে বাধ্য হয়ে অনেকেই দালালের দ্বারস্থ হচ্ছেন।

‘ট্রেনিং কার’ ব্যবহার করে দালাল প্রবেশ—অভিযোগের নতুন মাত্রা

আরও চাঞ্চল্যকর অভিযোগ হলো, ড্রাইভিং স্কুলের ‘ট্রেনিং কার’ ব্যবহার করে দালালদের কার্যালয় চত্বরে প্রবেশের ব্যবস্থা করা হয়। এতে তারা নিরাপত্তা তল্লাশি বা নজরদারি এড়িয়ে পরীক্ষাকেন্দ্র ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে সহজে যাতায়াত করতে পারেন। একাধিক সূত্রের দাবি, দালালরা হোয়াটসঅ্যাপ বা অন্যান্য মাধ্যমে নির্দিষ্ট রোল নম্বর পাঠালে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর ফলাফলে অনিয়ম করা হয়। যদিও এ অভিযোগের স্বাধীন যাচাই এখনও সম্ভব হয়নি, তবে একাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে একই ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে।

ফিটনেস সনদেও অনিয়মের অভিযোগ

অনিয়ম কেবল লাইসেন্স পরীক্ষায় সীমাবদ্ধ নয়—এমন অভিযোগ রয়েছে যানবাহনের ফিটনেস সনদ প্রদানে। অভিযোগকারীদের দাবি, যেসব গাড়ি ন্যূনতম নিরাপত্তা মান পূরণ করে না, সেগুলোকেও দালালের মাধ্যমে অনায়াসে ফিটনেস দেওয়া হচ্ছে। ফলে ব্রেক, লাইট, সাসপেনশন বা নির্গমন মানদণ্ডে অযোগ্য গাড়িও সড়কে চলাচলের অনুমতি পাচ্ছে। এতে সড়ক নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ছে বলে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা।

পরিবহন খাতসংশ্লিষ্ট এক অভিজ্ঞ ব্যক্তির ভাষ্য, ফিটনেস পরীক্ষায় যদি কারিগরি যাচাই যথাযথভাবে না হয়, তবে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যে প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে অনিয়ম হলে তার প্রভাব সারাদেশেই পড়তে পারে।

ফাইল সই, নামজারি ও রেজিস্ট্রেশন—সবখানেই দালাল নির্ভরতা?

অভিযোগ রয়েছে, দাপ্তরিক ফাইলে সই করানো, নামজারি, মালিকানা পরিবর্তন কিংবা রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত কাজেও একই চিত্র। কেউ সরাসরি আবেদন জমা দিলে তা দিনের পর দিন পড়ে থাকে। অথচ দালালের মাধ্যমে গেলে একই কাজ দ্রুত সম্পন্ন হয়। এতে সাধারণ মানুষ সময় ও অর্থ—দুই দিক থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কেউ কেউ বলেন, অফিসে গিয়ে সরাসরি কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করতে চাইলেও নানা অজুহাতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

এমন পরিস্থিতিতে সেবা নিতে আসা মানুষ নিজেদের অসহায় মনে করছেন। একজন ভুক্তভোগী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সরকারি অফিসে এসে যদি দালালের কাছে যেতে হয়, তাহলে নিয়ম মেনে চলার মূল্য কোথায়?”

প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির অভিযোগ

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, এটি কেবল বিচ্ছিন্ন অনিয়ম নয়; বরং একটি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির রূপ নিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে দালালদের অবাধ বিচরণ, অভিযানের অভাব, এবং অভিযোগের পরও দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া—এসব মিলিয়ে সিন্ডিকেট আরও শক্তিশালী হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অতীতে মাঝেমধ্যে অভিযান চালানো হলেও তা স্থায়ী সমাধান আনতে পারেনি—এমন অভিযোগ রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিজিটাল প্রক্রিয়া জোরদার, পরীক্ষায় সিসিটিভি বাধ্যতামূলক করা, ফলাফল প্রকাশে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং ফিটনেস পরীক্ষায় প্রযুক্তিনির্ভর যাচাই—এসব ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতির উন্নতি কঠিন হবে। একই সঙ্গে অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।

তদন্ত ও জবাবদিহির দাবি

ভুক্তভোগী ও স্থানীয়রা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে দ্রুত তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, নিরপেক্ষ তদন্ত হলে অর্থ লেনদেন, ফলাফলে কারসাজি এবং ফিটনেস সনদ প্রদানে অনিয়ম—সবই উন্মোচিত হবে। তদন্ত চলাকালে সংশ্লিষ্টদের প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে সাময়িক অব্যাহতি দেওয়ার দাবিও উঠেছে, যাতে প্রভাব খাটিয়ে প্রমাণ নষ্টের সুযোগ না থাকে।

কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, লিখিত অভিযোগ পেলে তা খতিয়ে দেখা হবে এবং প্রমাণ মিললে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। স্থানীয়দের দাবি, অতীতে এমন আশ্বাস বহুবার মিললেও বাস্তবে পরিবর্তন দেখা যায়নি। তাই তারা এবার দৃশ্যমান পদক্ষেপ চান—শুধু আশ্বাস নয়।

আস্থার সংকট ও জনস্বার্থের প্রশ্ন

সরকারি সেবা নিতে এসে দালালের হাতে জিম্মি হওয়া, নিয়ম মেনেও হয়রানির শিকার হওয়া—এসব অভিজ্ঞতা মানুষের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে। সড়ক নিরাপত্তা ও জনস্বার্থের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি প্রতিষ্ঠানে যদি স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তবে তার প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষ চালক তৈরি ও ঝুঁকিমুক্ত যানবাহন নিশ্চিত করা শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়—এটি জননিরাপত্তার মৌলিক শর্ত।

সব মিলিয়ে কেরানীগঞ্জের ইকুরিয়া বিআরটিএ কার্যালয়ে অনিয়ম ও দালালনির্ভরতার যে অভিযোগ উঠে এসেছে, তা গভীর উদ্বেগের বিষয়। দ্রুত তদন্ত, জবাবদিহি ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মাধ্যমে দায়ীদের আইনের আওতায় আনা না গেলে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সুশাসন ও সড়ক নিরাপত্তার স্বার্থে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জোরালো হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *