এসআই জহিরুলের বিরুদ্ধে আটক বাণিজ্য, চাঁদাবাজি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ

স্টাফ রিপোর্টার:

ঢাকার কেরানীগঞ্জ মডেল থানাধীন আটিবাজার এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকা পুলিশ ক্যাম্পটি এখন যেন অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ক্যাম্প ইনচার্জ এসআই জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে টাকার বিনিময়ে মাদক ব্যবসায়ীকে ছেড়ে দেওয়া, আটক বাণিজ্য, চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি প্রদর্শনসহ একের পর এক গুরুতর অভিযোগ উঠলেও তিনি এখনো বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করছেন বলে দাবি স্থানীয়দের। এতে এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষোভ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, আটিবাজার পুলিশ ক্যাম্প সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার জায়গা হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে এটি অনেকের কাছে ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাদক ব্যবসায়ী ও অপরাধীরা সহজেই পার পেয়ে গেলেও সাধারণ মানুষকে নানা অজুহাতে হয়রানি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, এসআই জহিরুল ইসলাম (বিপি আইডি নং ৮১০০০২৯৬৭১) তার কর্মজীবনে একাধিকবার বিভাগীয় শাস্তির মুখোমুখি হয়েছেন। বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, চাকরি জীবনে অন্তত পাঁচবার তিনি বিভাগীয় শাস্তি পেয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য তিনটি শাস্তির কারণে ২০০৫ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত বান্দরবান জেলার থানচি–লামা সার্কেল এলাকায় তাকে শাস্তিমূলক দায়িত্বে রাখা হয়েছিল।

এছাড়া ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৪ সালে বিভাগীয় পদোন্নতি পরীক্ষায় নকল করার সময় হাতে-নাতে ধরা পড়ার ঘটনাতেও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এর আগে ২৬ মে ২০১৩ সালে এক নারী বাদীকে নিয়ে বিবাদীর বাড়িতে গিয়ে মারধরের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। পরে পুলিশি তদন্তে ওই ঘটনার সত্যতা পাওয়ায় তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল বলে জানা গেছে।

এমন একজন কর্মকর্তা কীভাবে আবার ঢাকার মতো গুরুত্বপূর্ণ জেলায় বদলি হয়ে কেরানীগঞ্জের গুরুত্বপূর্ণ আটিবাজার পুলিশ ক্যাম্পে দায়িত্ব পেলেন—এ প্রশ্ন এখন স্থানীয়দের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে।

এসআই জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে পুলিশ সদর দপ্তরে মহাপুলিশ পরিদর্শক (আইজিপি) বরাবর একাধিক লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে। অভিযোগ করেছেন মোঃ রবিন (১০ ফেব্রুয়ারি), সাহেরা আক্তার (১৭ ফেব্রুয়ারি) এবং ৩ মার্চ মোঃ শুভ, রিয়াদ, দিপেল, ইয়ামিন ও দিপু আব্দুলসহ আরও কয়েকজন ভুক্তভোগী।

অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, আটিবাজার পুলিশ ক্যাম্পে নানা অনিয়ম ও হয়রানির ঘটনা ঘটলেও সেগুলোর কোনো প্রতিকার মিলছে না।

গত ডিসেম্বর মাসে মাধবদী এলাকা থেকে ছিনতাই হওয়া একটি ট্রাক ও তার মালামাল আটিবাজার এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়। ওই ঘটনায় জব্দ তালিকা প্রস্তুত করেন ক্যাম্প ইনচার্জ এসআই জহিরুল ইসলাম। কিন্তু স্থানীয়দের দাবি, মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ট্রাকটি আবার ডাকাতির কবলে পড়ে। এতে প্রশ্ন উঠেছে এটি কি পেশাগত অদক্ষতা, নাকি ইচ্ছাকৃত গাফিলতি।

মধ্যেরচর গ্রামের বাসিন্দা শুভর অভিযোগ, ২ ফেব্রুয়ারি রাতে স্থানীয় জনতার সহায়তায় ইয়াবা ব্যবসায়ী জামালকে আটক করা হয়। পরে এএসআই হুমায়ূন ও নায়েক মনির তাকে পুলিশ হেফাজতে নেন। কিন্তু কিছু সময় পর ক্যাম্প ইনচার্জ জহিরুল ইসলামের সঙ্গে ফোনালাপের পর জামালকে আলাদা করে নিয়ে যাওয়া হয়।

ভুক্তভোগীদের দাবি, জামালের কাছে থাকা প্রায় ২০ হাজার টাকা তার মুক্তির ‘টিকিট’ হয়ে দাঁড়ায় এবং রাতের মধ্যেই তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

আরেকটি অভিযোগে জানা যায়, ২৭ জানুয়ারি কাঁঠালতলী এলাকার প্রবাসী রবিনের বাসায় সাদা পোশাকে অভিযান চালানো হয়। অভিযানের সময় তার পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হয় এবং তাকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করে নববিবাহিতা স্ত্রীসহ ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয় বলে অভিযোগ।

রবিনের দাবি, সেখানে তাকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে এক লাখ টাকা দাবি করা হয়। পরে প্রায় ১৬ ঘণ্টা আটকে রাখার পর ৫০ হাজার টাকা নেওয়ার পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। স্থানীয়দের দাবি, কাঁঠালতলী গ্রামের মামুন মাতুব্বরের মাধ্যমে ওই টাকার লেনদেন করা হয়। বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়া এবং দীর্ঘ সময় আটকে রাখার দৃশ্য সিসিটিভি ফুটেজেও দেখা গেছে বলে দাবি করেছেন তারা।

স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, রবিন ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা অভিযোগ দেখাতে পারেননি এসআই জহিরুল ইসলাম। তাহলে তাদের প্রায় ১৬ ঘণ্টা আটকে রাখা হলো কেন—এই প্রশ্ন তুলে তারা সিনিয়র কর্মকর্তাদের কাছে সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

এদিকে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি আরেকটি ঘটনা এলাকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। অভিযোগ রয়েছে, ব্যবসায়ী আনোয়ারকে তার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে বলে ধরে নিয়ে যেতে চান এসআই জহিরুল ইসলাম। এ সময় আনোয়ারের পরিবার নিজেদের পুলিশ পরিবারের সদস্য পরিচয় দিয়ে মামলা বা ওয়ারেন্টের কাগজ দেখতে চাইলে জহিরুল ইসলাম উত্তেজিত হয়ে আনোয়ারের স্ত্রী সাহেরা আক্তারকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সাহেরা আক্তারের দাবি, তখন এসআই জহিরুল ইসলাম বলেন—“জহির কাউকে ধরতে গেলে কাগজ লাগে না।” এ সময় পরিবারের আরও কয়েকজনের সঙ্গেও ধস্তাধস্তি হয় বলে অভিযোগ।

স্থানীয়দের তোপের মুখে পড়ে তিনি ওয়ারেন্টের কাগজ দেখাতে ব্যর্থ হন। পরে তিনি বলেন, হাজারীবাগ থানায় চেক সংক্রান্ত একটি মামলা রয়েছে। কিন্তু স্থানীয়দের প্রশ্ন ছিল—যদি মামলা হাজারীবাগ থানার হয়, তাহলে ওই থানার পুলিশ কেন অভিযানে উপস্থিত ছিল না?

এ সময় ধস্তাধস্তির মধ্যে আনোয়ারকে নিয়ে যাওয়ার সময় বাদীপক্ষের একজন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকে প্রকাশ্যে বলতে শোনা যায়, “৬০ হাজার টাকা দিয়ে জহিরকে এনেছি ধরে নেওয়ার জন্য।”

পরে ফাঁড়ির গাড়িচালক নায়েক মনিরের মোবাইল ফোনে এক ব্যক্তি ঘটনাটি জানতে চাইলে তিনি বলেন, “সার্কেল জাহাঙ্গীরকে ম্যানেজ করতে এসআই জহির থানায় যাচ্ছেন, ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে।”

এ ঘটনার পর স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—তাহলে কি সার্কেল কর্মকর্তার ছত্রছায়াতেই এমন কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন এসআই জহিরুল ইসলাম?

এলাকাবাসীর অভিযোগ, আটিবাজার এলাকায় বিভিন্ন উৎস থেকেও নিয়মিত মাসোহারা আদায়ের ঘটনা ঘটে। সুজন হাউজিং এলাকার ম্যানেজারের মাধ্যমে প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা আদায় করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া ফাঁড়ির পেছনের বালুর মাঠে বসা সাপ্তাহিক মেলা থেকেও ১০ বস্তা চাল উৎকোচ হিসেবে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয় কয়েকজনের মাধ্যমে দোকানদারদের কাছ থেকে চাল সংগ্রহ করা হয় বলেও দাবি করেছেন তারা।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, আটিবাজার পুলিশ ক্যাম্প এখন সাধারণ মানুষের কাছে আতঙ্কের নাম। মাদক ব্যবসায়ীরা সহজেই পার পেয়ে যায়, অথচ সাধারণ মানুষকে মামলা ও হয়রানির ভয় দেখানো হয়।

এছাড়া স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি ও চিহ্নিত অপরাধীদের সঙ্গে ক্যাম্প ইনচার্জের ঘনিষ্ঠতার অভিযোগও উঠেছে। এমনকি এলাকায় জুয়ার বোর্ড পরিচালনার সঙ্গেও তার নাম জড়িয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ক্যাম্প ইনচার্জ এসআই জহিরুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি সিনিয়র কর্মকর্তারা দেখবেন। এরপরই তিনি ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

কেরানীগঞ্জ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল আলম বলেন, “আপনারা জাতির চতুর্থ স্তম্ভ। আমরা আশা করি আপনারা বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ করবেন।” তবে বিষয়টির কিছুটা জানেন বলেও তিনি স্বীকার করেন।

এ বিষয়ে কেরানীগঞ্জ সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জাহাঙ্গীর বলেন, যদি পুলিশ সদর দপ্তরে অভিযোগ দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মানবাধিকারকর্মী মাসুদ বলেন, একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযোগ কেবল ব্যক্তিগত বিষয় নয়; এটি পুরো পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তির প্রশ্ন। তাই দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি।

এখন স্থানীয়দের প্রশ্ন—এত অভিযোগের পরও কি নীরব থাকবে পুলিশ সদর দপ্তর, নাকি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন করে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *