কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:
কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলায় একটি মারাত্মক হামলার ঘটনায় এজাহারভুক্ত এক আসামির নাম চার্জশিট থেকে বাদ পড়াকে কেন্দ্র করে এলাকায় তীব্র আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। হত্যার উদ্দেশ্যে ধারালো অস্ত্র দিয়ে গুরুতর জখমের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট আসামির নাম চার্জশিটে না থাকায় ন্যায়বিচার নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন ভুক্তভোগী পরিবার ও এলাকাবাসী।
জানা গেছে, উলিপুর উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের দামুয়ারপাড় এলাকার বাসিন্দা কাইয়ুম আলী ও তার বড় ভাই মো. আবুল কালামের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে পারিবারিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিরোধ চলে আসছিল। এরই জেরে গত ২৩ মে ২০২৫ তারিখে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
এজাহার সূত্রে জানা যায়, ঘটনার দিন পরিকল্পিতভাবে মো. রুবেল আহমেদ, আরিফ মিয়া, মো. আবুল কালাম, মো. এরশাদুল হকসহ কয়েকজন ব্যক্তি লাঠি, ধারালো ছোড়া, লোহার রড, দা ও খন্তাসহ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে কাইয়ুম আলীর পরিবারের ওপর হামলা চালায়। এ সময় কাইয়ুম আলী ও তার ছেলে রিপন মিয়া বাধা দিলে মো. আবুল কালামের নির্দেশে মো. রুবেল আহমেদের হাতে থাকা ধারালো ছোড়া দিয়ে কাইয়ুম আলীর মাথার সামনের অংশে আঘাত করা হয়। এতে তিনি গুরুতর রক্তাক্ত জখম হন এবং মাথায় ছয়টি সেলাই দিতে হয়।
হামলাকারীরা এতে ক্ষান্ত না হয়ে পুনরায় আরিফ মিয়া তার হাতে থাকা ধারালো অস্ত্র দিয়ে কাইয়ুম আলীকে হত্যার উদ্দেশ্যে আঘাত করলে তা মাথার পেছনে লাগে। এতে আরও চারটি সেলাই দিতে হয়। একই সময় কাইয়ুম আলীর ছেলে রিপন মিয়া (১৮) কে তার আপন চাচা আবুল কালাম ধারালো ছোড়া দিয়ে হত্যার উদ্দেশ্যে আঘাত করেন। আঘাতটি তার মাথার বাম পাশে কানের ওপর লাগে এবং এতে তিনটি সেলাই পড়ে।
এছাড়াও হামলাকারীরা কাইয়ুম আলীর স্ত্রী মোছাঃ রুজিনা বেগমকে এলোপাতাড়ি মারধর করে এবং তার শ্লীলতাহানির অভিযোগ রয়েছে।
পরে এলাকাবাসী আহতদের উদ্ধার করে কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক উন্নত চিকিৎসার জন্য তাদের রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করেন। তবে তাৎক্ষণিক লোকবল ও আর্থিক সমস্যার কারণে তারা রংপুরে যেতে না পেরে কুড়িগ্রাম ও উলিপুর হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণ করেন।
ঘটনার বিচার চেয়ে আহত কাইয়ুম আলীর স্ত্রী মোছাঃ রুজিনা বেগম বাদী হয়ে ১৭ জুন ২০২৫ তারিখে উলিপুর থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় মো. রুবেল আহমেদ (২৪) কে ১ নম্বর, মো. আরিফ মিয়া (৩২) কে ২ নম্বর, মো. আবুল কালাম (৬০) কে ৩ নম্বর, মোছাঃ বানেছা বেগম (৫৬) কে ৪ নম্বর, মো. এরশাদুল হক (৩৩) কে ৫ নম্বর এবং মোছাঃ বিজলী বেগম (২৮) কে ৬ নম্বর আসামি করা হয়। থানায় মামলাটি গ্রহণ করে দণ্ডবিধির ১৪৩, ৪৪৮, ৩২৬, ৩৫৪সহ অন্যান্য ধারায় রুজু করা হয়।
পরবর্তীতে পুলিশ তদন্ত শেষে ৩০ আগস্ট ২০২৫ তারিখে মামলাটির চার্জশিট কুড়িগ্রাম চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দাখিল করে। তবে চার্জশিটে হত্যার উদ্দেশ্যে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কাইয়ুম আলীর মাথায় গুরুতর আঘাতকারী ২ নম্বর আসামি মো. আরিফ মিয়ার নাম বাদ দেওয়া হয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় তীব্র আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় ওঠে।
এ ঘটনায় বাদীপক্ষ চার্জশিটের বিরুদ্ধে নারাজি আবেদন করলে বিজ্ঞ আদালত তা মঞ্জুর করে মামলাটির পুনরায় তদন্তের দায়িত্ব ডিবি পুলিশের কাছে ন্যস্ত করেন। বর্তমানে মামলাটির পুনঃতদন্ত চলমান রয়েছে এবং তদন্ত শেষে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ইয়াসমিন বেগম বলেন, ঘটনার দিন দুই পক্ষের সংঘর্ষ হয়, এতে কাইয়ুম আলী ও তার ছেলে গুরুতর আহত হয়। আমরা চাই, দোষীদের সঠিক বিচার হোক।
এলাকাবাসী জয়নাল আবেদিন বলেন, আইনের প্রতি আমাদের আস্থা আছে। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীরা যেন শাস্তির আওতায় আসে, সেটাই এলাকাবাসীর প্রত্যাশা।
অন্যদিকে প্রত্যক্ষদর্শী আব্দুস সালাম বলেন, ঘটনার দিন আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কাইয়ুমের পরিবারের ওপর বর্বরোচিত হামলা চালানো হয়। এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার হওয়া জরুরি।
বাদীর ছোট ভাই মিজানুর রহমান বলেন, আমার বোন, ভগ্নিপতি ও ভাগিনাকে এলোপাতাড়ি মারধর করে রক্তাক্ত জখম করা হয়। মামলার এজাহারে থাকা ২ নম্বর আসামি আরিফ মিয়া একজন বহিরাগত সন্ত্রাসী। সে আমার ভগ্নিপতিকে হত্যার উদ্দেশ্যে আঘাত করে। অথচ তার নাম চার্জশিট থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। মামলার পর সে বিজিবিতে চাকরিতে যোগ দেয়। আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল বলেই নারাজি আবেদন করেছি। আদালত তা মঞ্জুর করেছেন। আমরা ন্যায়বিচার পাবো বলে আশাবাদী।
মামলার বাদী মোছাঃ রুজিনা বেগম অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বলেন, বিচারের আশায় আমরা আইনের দ্বারস্থ হয়েছি। যে ব্যক্তি আমার স্বামীকে হত্যার উদ্দেশ্যে রক্তাক্ত জখম করেছে, তার নাম চার্জশিট থেকে কীভাবে বাদ যায়—আমি এর বিচার চাই।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত বিবাদীদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।