স্টাফ রিপোর্টার:
খুলনায় আঞ্চলিক ও জেলা খাদ্য অধিদপ্তরের চলমান দুর্নীতি ও অনিয়ম নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশের জেরে এক সাংবাদিককে জীবননাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় সাংবাদিক মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেন সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষকে অবগত করেছেন এবং নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি দৈনিক স্বাধীন সংবাদ–এর খুলনা ব্যুরো প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন; পাশাপাশি বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড প্রেস সোসাইটির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য, ন্যাশনাল প্রেস সোসাইটির কার্যনির্বাহী সদস্য (১) এবং পাক্ষিক নির্ভীক সংবাদের খুলনা ব্যুরো প্রধান হিসেবেও কাজ করছেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়, মানবাধিকার, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক অনিয়ম নিয়ে প্রতিবেদন করে আসছেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, সম্প্রতি খুলনা আঞ্চলিক ও জেলা খাদ্য অধিদপ্তরে ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান, ওএমএস (ওপেন মার্কেট সেল) কার্যক্রম, গুদামের বস্তা ক্রয়, বদলি বাণিজ্য এবং ডিলার ব্যবস্থাপনায় নানা ধরনের অনিয়ম ও ঘুষ বাণিজ্যের তথ্য উঠে আসে। বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতি কেজি ধান-চাল সংগ্রহে ১০ পয়সা থেকে ১ টাকা পর্যন্ত অবৈধ অর্থ আদায়, ভুয়া কৃষকের নামে বিল উত্তোলন, পুরোনো বস্তা পুনঃব্যবহার করে বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ, ডিলারদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় এবং বদলির নামে অর্থ লেনদেনের মতো অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগ প্রকাশিত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট মহলে অস্বস্তি তৈরি হয় এবং এরই প্রেক্ষাপটে সাংবাদিক মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেনকে সরাসরি জীবননাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
হুমকিদাতারা অজ্ঞাতনামা হলেও সাংবাদিকের ধারণা, খাদ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো স্বার্থান্বেষী চক্র এর পেছনে থাকতে পারে। তিনি জানান, ফোন ও বিভিন্ন মাধ্যমে তাকে ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে এবং সংবাদ প্রকাশ বন্ধ না করলে “খারাপ পরিণতি” ভোগ করতে হবে—এমন ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি তিনি গুরুত্ব সহকারে নিয়ে প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে অবহিত করেছেন। খুলনায় অতীতেও বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের অনিয়ম তুলে ধরায় সাংবাদিকদের ওপর হামলা, লাঞ্ছনা ও হুমকির ঘটনা ঘটেছে বলে স্থানীয় সাংবাদিক মহল উল্লেখ করেছে।
খাদ্য অধিদপ্তর ঘিরে ওঠা অভিযোগের মধ্যে রয়েছে আঞ্চলিক পর্যায়ে প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকা, যারা ধান-চাল সংগ্রহ মৌসুমে কৃষকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে এবং গুদামের ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি সংগ্রহ দেখিয়ে অনিয়মের সুযোগ সৃষ্টি করে। এছাড়া ওএমএস কার্যক্রমে চাল-আটা বিতরণে কমিশন বাণিজ্য ও অনিয়মের অভিযোগও সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করেছে, এসব অনিয়মের ফলে প্রকৃত সুবিধাভোগীরা বঞ্চিত হচ্ছেন এবং সরকারি খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর আস্থা কমে যাচ্ছে। অতীতে কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুদকের মামলার নজিরও রয়েছে, যা এই খাতকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
সাংবাদিক মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশ করা তার পেশাগত ও নৈতিক দায়িত্ব। দুর্নীতি, অনিয়ম ও স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করাই গণমাধ্যমের কাজ। কিন্তু সেই কাজ করতে গিয়ে যদি জীবননাশের হুমকির মুখে পড়তে হয়, তবে তা কেবল একজন ব্যক্তির জন্য নয়, সামগ্রিকভাবে সাংবাদিকতার স্বাধীনতার জন্যও উদ্বেগজনক। তিনি মনে করেন, এ ধরনের হুমকি অব্যাহত থাকলে দুর্নীতিবিরোধী অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বাধাগ্রস্ত হবে এবং সাধারণ মানুষ প্রকৃত তথ্য থেকে বঞ্চিত হবে।
ঘটনার পর তিনি পুলিশ প্রশাসন, জেলা প্রশাসন, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), খাদ্য অধিদপ্তর এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে লিখিত ও মৌখিকভাবে অবগত করেছেন। তার দাবি, হুমকিদাতাদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হোক, খাদ্য অধিদপ্তরের অভিযোগগুলো যৌথভাবে তদন্ত করা হোক এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক। পাশাপাশি অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
খুলনার সাংবাদিক সমাজ, মানবাধিকারকর্মী ও সচেতন নাগরিকদের একটি অংশও এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা মনে করেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলা এবং অনিয়ম তুলে ধরা গণতান্ত্রিক সমাজে অপরাধ হতে পারে না। বরং এ ধরনের প্রতিবেদন প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সহায়ক। ফলে একজন সাংবাদিককে হুমকি দেওয়া মানে কেবল ব্যক্তিকে নয়, পুরো গণমাধ্যমকেই চাপে ফেলা।
সার্বিকভাবে ঘটনাটি খুলনার খাদ্য ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত এবং হুমকির ঘটনার দ্রুত প্রতিকারই এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় জনস্বার্থে কাজ করা সাংবাদিকরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবেন এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার পরিবেশ সংকুচিত হয়ে পড়বে—এমন আশঙ্কা সংশ্লিষ্ট মহলের।