জবাবদিহিতার রাজনীতি ও ছায়া মন্ত্রীসভা 

মোহাম্মদ আলাউদ্দিন:
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঘোষিত ছায়া মন্ত্রীসভা গঠনের পরিকল্পনাকে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক পরিসরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। একটি বিরোধী রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ছায়া মন্ত্রীসভা গঠনের ঘোষণা নিছক কৌশলগত পদক্ষেপ নয়; বরং এটি গণতান্ত্রিক চর্চাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ বলে মনে করা হচ্ছে। বাংলাদেশের মতো সংসদীয় গণতন্ত্রে ছায়া মন্ত্রীসভা প্রতিষ্ঠা হলে তা সরকারকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে সহায়ক হতে পারে, নীতি-প্রস্তাবে গঠনমূলক বিকল্প তুলে ধরতে পারে এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ইতিবাচক প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করতে পারে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিরোধী দলের ভূমিকা অনেক সময়ই কেবল আন্দোলন-সমাবেশ কিংবা বিবৃতি প্রদানে সীমাবদ্ধ থাকে। সংসদে কার্যকর বিতর্ক, নীতিগত পর্যালোচনা এবং বিকল্প প্রস্তাব উপস্থাপনের ধারাবাহিক সংস্কৃতি এখনও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ছায়া মন্ত্রীসভা সেই ঘাটতি পূরণে একটি কাঠামোবদ্ধ পদ্ধতি এনে দিতে পারে। প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের বিপরীতে একজন করে দায়িত্বশীল ছায়া মন্ত্রী থাকলে সংশ্লিষ্ট খাতের সরকারি সিদ্ধান্ত, বাজেট বরাদ্দ, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও নীতিমালার উপর নিয়মিত বিশ্লেষণ সম্ভব হবে।
সংসদীয় গণতন্ত্রের জনক হিসেবে পরিচিত যুক্তরাজ্যে এই চর্চা বহুদিনের। সেখানে বিরোধী দল “শ্যাডো ক্যাবিনেট” গঠন করে সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের কর্মকাণ্ডের সমান্তরাল নজরদারি চালায়। ফলে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে নীতিগত বিতর্ক সমৃদ্ধ হয় এবং জনগণ বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে অবহিত হতে পারে। বাংলাদেশেও যদি এই চর্চা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়, তবে তা রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে পরিণত ও দায়িত্বশীল করে তুলবে।
ছায়া মন্ত্রীসভার অন্যতম বড় সুফল হলো জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। সরকারের যেকোনো নীতি বা সিদ্ধান্তের বিপরীতে যদি তাৎক্ষণিক, তথ্যভিত্তিক এবং সুসংগঠিত প্রতিক্রিয়া আসে, তাহলে নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা বাড়ে। উদাহরণস্বরূপ- শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, বিদ্যুৎ, অর্থনীতি বা পররাষ্ট্রনীতির মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে ছায়া মন্ত্রীরা নিয়মিত বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করলে জনগণ প্রকৃত চিত্র সম্পর্কে অবগত হতে পারবেন। একইসঙ্গে সরকারের পক্ষেও ভুল সংশোধন বা নীতিগত ঘাটতি পূরণের সুযোগ তৈরি হবে।
বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, কর্মসংস্থান, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রযুক্তিগত রূপান্তর ও সামাজিক ন্যায়বিচারের মতো বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট বিকল্প পরিকল্পনা উপস্থাপন না করলে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি জনগণের আস্থা গড়ে ওঠে না। ছায়া মন্ত্রীসভা থাকলে সংশ্লিষ্ট খাতে দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা ও গবেষণাভিত্তিক প্রস্তাব তৈরি করা সম্ভব হবে। এতে দলীয় অবস্থান স্পষ্ট হবে এবং ভবিষ্যৎ নির্বাচনে জনগণ তুলনামূলক মূল্যায়ন করতে পারবেন।
রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য এটি একটি আত্ম-প্রস্তুতির প্রক্রিয়াও বটে। সরকার গঠনের সুযোগ এলে যেন তাৎক্ষণিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করা যায়, সে জন্য আগেভাগে দক্ষ জনবল প্রস্তুত রাখা প্রয়োজন। ছায়া মন্ত্রীসভা সেই প্রস্তুতির ক্ষেত্র তৈরি করে। নীতিগত প্রশিক্ষণ, তথ্য বিশ্লেষণ, আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া সম্পর্কে অভিজ্ঞতা- এসবই একটি দলকে দায়িত্বশীল শাসন পরিচালনায় সহায়তা করে। ফলে ক্ষমতায় গেলে হঠাৎ সিদ্ধান্তের পরিবর্তে সুপরিকল্পিত কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রায়শই দেখা যায়, দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস ও সংঘাত প্রাধান্য পায়। ছায়া মন্ত্রীসভা যদি কেবল সমালোচনার হাতিয়ার না হয়ে গঠনমূলক সহযোগিতার ক্ষেত্র হয়ে ওঠে, তাহলে রাজনৈতিক মেরুকরণ কিছুটা হলেও কমতে পারে। নীতিগত বিষয়ে যুক্তিপূর্ণ বিতর্ক ও প্রস্তাব-প্রতিপ্রস্তাবের চর্চা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে।
অবশ্য ছায়া মন্ত্রীসভা কার্যকর করতে হলে কয়েকটি শর্ত পূরণ জরুরি। প্রথমত, এটি যেন কেবল নামসর্বস্ব না হয়; বরং প্রতিটি ছায়া মন্ত্রীকে নির্দিষ্ট দায়িত্ব ও জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ, গবেষণা দল গঠন এবং গণমাধ্যমে তথ্যভিত্তিক বক্তব্য উপস্থাপন অপরিহার্য। দ্বিতীয়ত, ব্যক্তিগত আক্রমণ বা বিদ্বেষমূলক বক্তব্য পরিহার করে নীতিগত সমালোচনায় মনোযোগ দিতে হবে। তৃতীয়ত, জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে খোলা আলোচনার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। যেমন- সেমিনার, ওয়েবিনার বা নীতি-সংলাপ।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো স্বচ্ছতা। ছায়া মন্ত্রীসভা কীভাবে কাজ করবে, তাদের প্রস্তাব কীভাবে তৈরি হবে এবং কোন সূত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হবে- এসব বিষয় পরিষ্কারভাবে জানানো প্রয়োজন। এতে জনআস্থা বৃদ্ধি পাবে এবং উদ্যোগটি কেবল রাজনৈতিক প্রচারণা হিসেবে বিবেচিত হবে না।
গণতন্ত্রে শক্তিশালী বিরোধী দল রাষ্ট্রের ভারসাম্য রক্ষার অন্যতম স্তম্ভ। সরকার যদি নীতিনির্ধারণের কেন্দ্র হয়, তবে বিরোধী দল সেই নীতির সমালোচনামূলক বিশ্লেষণের কেন্দ্র। ছায়া মন্ত্রীসভা এই ভারসাম্যকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে আস্থাহীনতা ও উত্তেজনা বিরাজমান, তা দূর করতে গঠনমূলক উদ্যোগ প্রয়োজন।
একইসঙ্গে মনে রাখতে হবে, ছায়া মন্ত্রীসভা গঠন মানেই রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র করা নয়; বরং নীতিগত প্রতিযোগিতাকে ইতিবাচক রূপ দেওয়া। জনগণ চায় উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তা। এই চারটি মৌলিক চাহিদা পূরণে যে দল সবচেয়ে বাস্তবসম্মত ও কার্যকর পরিকল্পনা দিতে পারবে, জনগণ স্বাভাবিকভাবেই তাদের প্রতি আস্থা রাখবে। ছায়া মন্ত্রীসভা সেই পরিকল্পনাগুলোকে সুসংগঠিতভাবে উপস্থাপনের সুযোগ সৃষ্টি করে।
বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন ও তথ্যপ্রযুক্তিতে পারদর্শী। তারা কেবল আবেগনির্ভর রাজনীতি নয়, তথ্যনির্ভর ও যুক্তিনির্ভর রাজনীতি প্রত্যাশা করে। ছায়া মন্ত্রীসভা নিয়মিত তথ্য বিশ্লেষণ ও নীতি-প্রস্তাব প্রকাশ করলে তরুণদের অংশগ্রহণ ও আগ্রহ বাড়তে পারে। রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় শিক্ষিত ও দক্ষ তরুণদের সম্পৃক্ততা দেশের ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক।
আমরা আশাবাদী, ছায়া মন্ত্রীসভা গঠনের উদ্যোগ যদি আন্তরিকতা, দক্ষতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় একটি মাইলফলক হতে পারে। সমালোচনা ও সমর্থনের ঊর্ধ্বে উঠে বিষয়টিকে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি উন্নয়নের একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা উচিত। শক্তিশালী সরকার যেমন প্রয়োজন, তেমনি শক্তিশালী ও সুসংগঠিত বিরোধী দলও প্রয়োজন। উভয়ের গঠনমূলক প্রতিযোগিতাই শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র ও জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করতে পারে।
মোহাম্মদ আলাউদ্দিন
অর্থ-সম্পাদক: নাঙ্গলকোট প্রেস ক্লাব, কুমিল্লা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *