মোহাম্মদ হোসেন হ্যাপী:
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকায় মালিকানা জমি দখল, আদালতের স্থিতিবস্থা উপেক্ষা এবং অনুমোদনবিহীন বহুতল ভবন নির্মাণ নিয়ে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা। অভিযোগে বলা হচ্ছে, আদালতের স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও সানরাইজ ল্যান্ডমার্ক লিমিটেড নির্মাণকাজ থামায়নি, বরং আগের তুলনায় আরও দ্রুতগতিতে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয়রা দাবি করেছেন, প্রশাসনের রহস্যজনক নীরবতা ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের এই দুঃসাহসকে আরও উসকে দিচ্ছে।
জমির প্রকৃত মালিক আবু আকরাম কাওছার ফতুল্লা মডেল থানার ওসিসহ জেলা প্রশাসক এবং পুলিশ সুপারের কাছে একাধিকবার অভিযোগ করলেও কোনো ফল পাননি। তিনি জানান, তার মালিকানাধীন মোট প্রায় ১.৫০ শতাংশ জমিতে জোরপূর্বক প্রবেশ করে সানরাইজ ল্যান্ডমার্ক লিমিটেডের মালিক আমান হুদা এবং সংশ্লিষ্ট মালিকরা—আব্দুর রহমান, আঃ রহিম, ইউসুফ আমিন ও আনিসুর হাসান—নির্মাণকাজ শুরু করেন। আবু আকরাম দাবি করেছেন, তার অনুরোধ সত্ত্বেও তারা দখলকৃত অংশ ফেরত দেয়নি।
পরিস্থিতি জটিল হওয়ায় আবু আকরাম দেওয়ানী মোকদ্দমা নং ৯২/২০২৫ দায়ের করেন। মামলার পর আদালত ১৬ অক্টোবর স্থিতিবস্থা বজায় রাখার আদেশ দেন এবং কোন ধরনের নির্মাণকাজ না করার নির্দেশ জারি করেন। কিন্তু আদালতের নির্দেশিত পক্ষদের হাতে পৌঁছানোর পরও বিবাদীরা নির্মাণকাজ বন্ধ না করে আরও উপরের তলার কাজ এগিয়ে নেন। নিষেধাজ্ঞা জারির সময় ভবনটি ছিল ৮ম তলা পর্যন্ত; এখন তারা ৯ম তলার কাজ শেষ করে ১০ তলার কাজও শুরু করেছে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, একটি ডেভেলপার কোম্পানি কীভাবে আদালতের স্পষ্ট আদেশ অমান্য করে প্রকাশ্যে বহুতল ভবন নির্মাণ চালিয়ে যেতে পারে। কেন প্রশাসন এ বিষয়ে নীরব? এসব প্রশ্নের উত্তর কেউ দিতে পারছে না। একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “এখানে আদালত বলে কিছু আছে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পরও যদি কেউ ১০ তলা পর্যন্ত কাজ করতে পারে, তাহলে সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে?”
অভিযোগকারী আবু আকরাম কাওছার বলেন, “আদালতের নির্দেশ অমান্য করা শুধু আইনের প্রতি অবজ্ঞাই নয়, বরং ক্ষমতা ও প্রভাবের অপব্যবহারের নগ্ন প্রদর্শন। আমি জেলা প্রশাসকের অফিসে গিয়েছি, পুলিশ সুপারের অফিসে গিয়েছি, থানায় গিয়েছি, কিন্তু কেউই নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন করতে এগিয়ে আসেনি। এটি প্রশাসনের জন্য লজ্জাজনক।”
স্থানীয়রা মনে করছেন, ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের মালিকদের রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে প্রশাসন নীরব ভূমিকা পালন করছে। তারা প্রশ্ন তুলছেন, ডেভেলপারদের আসল ক্ষমতার উৎস কোথায় এবং কেন অভিযোগ করেও সাধারণ মানুষ ন্যায্য প্রতিকার পাচ্ছে না।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, চাষাড়া মৌজার সি এস, এস এ এবং আর এস খতিয়ানের দাগভুক্ত জমির ১.৫০ শতাংশ দখল হয়ে গেছে। আদালতের আদেশ লঙ্ঘন করে বহুতল নির্মাণ চলতে থাকায় ভবনটির নিরাপত্তা, স্থাপত্যগত ঝুঁকি এবং আশপাশের ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। নির্মাণকাজের শব্দ, ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার এবং শ্রমিকদের দিন-রাত কাজের কারণে এলাকাবাসীর স্বাভাবিক জীবনও ব্যাহত হচ্ছে।
অনুসন্ধানকালে দেখা গেছে, আদালতের নিষেধাজ্ঞার কপি মেনে নেওয়ার পরও সানরাইজ ল্যান্ডমার্ক লিমিটেডের কর্মীরা প্রকাশ্যেই কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। কোন সংস্থা বাধা না দেওয়ায় তারা মনে করছে, আইনের ঊর্ধ্বে থেকেই ভবন নির্মাণ করা সম্ভব।
আবু আকরাম কাওছার জানান, “আমার জমি দখল হওয়ার পাশাপাশি বিচার পাওয়ার অধিকারও লঙ্ঘিত হচ্ছে। একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে প্রশ্ন, আইন এবং আদালত সবই যদি উপেক্ষা করা হয়, তাহলে আমরা কোথায় যাবো?” তিনি অবিলম্বে নির্মাণকাজ বন্ধ করে আদালতের আদেশ কার্যকর করার দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয়রা মনে করছেন, দ্রুত প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে আদালতের নির্দেশ অকার্যকর হয়ে পড়েছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।