বন বিভাগ দেশের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান

মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেন:

বাংলাদেশে বন বিভাগ বারবার দেশের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) থেকে শুরু করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর সাম্প্রতিক তদন্ত—বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে বন বিভাগের দুর্নীতি এখন ‘ওপেন সিক্রেট’। এতে বনভূমি উজাড়, অবৈধ গাছ পাচার, প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ এবং পদোন্নতি ও বদলি-বাণিজ্য চলছে বেপরোয়াভাবে।

দুর্নীতির প্রধান চিত্র

প্রকল্পে বিপুল আত্মসাৎ: বন অধিদপ্তরের সবচেয়ে বড় প্রকল্প ‘সুফল’ (টেকসই বন ও জীবিকা)–এর আওতায় দেড় হাজার কোটি টাকার (প্রায় ১,৫০০ কোটি) কাজে দুর্নীতির প্রমাণ পেয়েছে দুদক। তদন্তে দেখা গেছে, প্রকল্পে বন বাগান তৈরি না করে ভুয়া কাগজে অর্থ উত্তোলন, বদলি-বাণিজ্যসহ নানা অনিয়ম চলছে। টিআইবির পুরোনো গবেষণায় দেখা গেছে, প্রকল্পের ফিল্ড লেভেলে ৬১% পর্যন্ত অর্থ আত্মসাৎ হয়েছে—এখনও এই ধারা অব্যাহত।

পদায়ন, বদলি ও পদোন্নতিতে বাণিজ্য: কর্মকর্তাদের পোস্টিং, ট্রান্সফার ও প্রমোশনে লাখ থেকে কোটি টাকার ঘুষ লেনদেন হয়। টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রধান বন সংরক্ষক থেকে শুরু করে বিট অফিসার পর্যন্ত এই ‘নিলাম’ চলে।

অবৈধ গাছ পাচার ও জমি দখল: সুন্দরবন, চট্টগ্রাম হিল ট্র্যাক্টস, বান্দরবান-লামা, উখিয়া, কক্সবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় বন কর্মকর্তাদের যোগসাজশে গাছ কাটা, পাচার, ইটভাটায় চাঁদা নেওয়া এবং বনভূমি দখল চলছে। স্থানীয় সিন্ডিকেটের সাথে মিলে এটি ‘দুর্নীতির বিশেষ জোন’ তৈরি করেছে।

উচ্চপদস্থদের জড়িততা: সাবেক বনমন্ত্রী, প্রধান বন সংরক্ষকসহ অনেকের বিরুদ্ধে দুদক অনুসন্ধান চালিয়েছে। চট্টগ্রামের রেঞ্জ অফিসার ও বিট অফিসারদের অবৈধ সম্পদের মামলায় জেলও হয়েছে।

সাম্প্রতিক ঘটনা ও প্রতিক্রিয়া

দুদকের সাম্প্রতিক অভিযানে বন অধিদপ্তরে নথি জব্দ করা হয়েছে এবং কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। টিআইবি বলছে, দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক হয়ে গেছে—কোনও কার্যকর তদারকি নেই। বিশ্লেষকরা মনে করেন, বন বিভাগকে ‘দুর্নীতির ডেরা’ বানানো হয়েছে, যার ফলে দেশের বনভূমি দ্রুত উজাড় হচ্ছে এবং জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে।

নতুন সরকারের পক্ষ থেকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির কথা বলা হলেও বন বিভাগে পরিবর্তনের লক্ষণ কম। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীলরা কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও, ভুক্তভোগী ও পরিবেশবাদীরা বলছেন—শুধু কথায় নয়, বাস্তবে অভিযান ও শাস্তি দরকার।

দুর্নীতির এই ধারার ফলে দেশের বন রক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকা চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *