নিজস্ব প্রতিবেদক:
বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজির (বিইউএফটি) প্রশাসনিক কাঠামো ও শিক্ষা পরিবেশ নিয়ে চরম উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আফসানা মেহেরুন আইনি ও তাকে মদদদাতা একটি প্রভাবশালী শিক্ষক চক্রের বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়ম, দুর্নীতি ও শিক্ষার্থীদের হয়রানির অভিযোগ এখন ক্যাম্পাসের প্রধান আলোচনার বিষয়। অভিযোগ উঠেছে, একের পর এক বিতর্কে জড়িয়ে পড়ার পরও অদৃশ্য এক ক্ষমতার বলে স্বপদে বহাল আছেন আফসানা মেহেরুন আইনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টোরিয়াল টিমের প্রভাবশালী তিনজন শিক্ষক সাব্বির আহমেদ আবির, রাকিবুল ইসলাম সিফাত ও ফারহানা জান্নাতের সমন্বয়ে গঠিত একটি শক্তিশালী বলয় তাকে রক্ষা করছে বলে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা দাবি করেছেন।
ঘটনার বিবরণে জানা যায়, আফসানা মেহেরুন আইনির বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতি ও অনিয়মের ফিরিস্তি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন ও ভিসি বরাবর ১৮ জন শিক্ষার্থী লিখিত অভিযোগ জমা দিলেও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি কর্তৃপক্ষ। উল্টো অভিযোগকারী শিক্ষার্থীদের বিভিন্নভাবে প্রশাসনিক চাপের মুখে ফেলে হয়রানি করার অভিযোগ উঠেছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিচার করার পরিবর্তে দোষীদের পক্ষ অবলম্বন করে সত্য ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এমনকি তার অনিয়ম নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলেও টনক নড়েনি কর্তৃপক্ষের। বরং লোকচক্ষুর অন্তরালে তাকে সুকৌশলে ছুটিতে ইতালি পাঠানোর পরিকল্পনা করছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, যা নিয়ে ক্যাম্পাসের সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে।
বিইউএফটির প্রক্টোরিয়াল টিমের ভূমিকা নিয়েও উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। অভিযোগ রয়েছে, প্রক্টোরিয়াল টিমের সদস্য রাকিবুল ইসলাম সিফাত প্রকাশ্যেই আফসানা মেহেরুন আইনির নির্দেশে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ক্লাস থেকে বের করে দেন। আইনির ব্যক্তিগত ইশারায় সিফাতের এমন আক্রমণাত্মক আচরণের ফলে ক্যাম্পাসে একাধিকবার উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, একজন শিক্ষকের ব্যক্তিগত স্বার্থ রক্ষায় প্রক্টোরিয়াল টিম কেন হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, তার সদুত্তর নেই প্রশাসনের কাছে।
অতীতেও এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের ব্যর্থতার কারণে এক শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার মতো মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু সেই ঘটনা থেকেও শিক্ষা নেয়নি বিইউএফটি কর্তৃপক্ষ। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের দাবি অনুযায়ী, এই শিক্ষিকা একাডেমিক ফলাফলকে ব্যক্তিগত আক্রোশ মেটানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন, যেখানে তার অনুগত বা পছন্দের নির্দিষ্ট কিছু শিক্ষার্থীকে অস্বাভাবিক একাডেমিক সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে এবং অন্যদিকে মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও অনেক শিক্ষার্থীকে ইচ্ছাকৃতভাবে কম নম্বর দিয়ে কিংবা ফলাফল আটকে রেখে তাদের ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে যে, সাবমিশন সংক্রান্ত কোনো যৌক্তিক জটিলতা নিয়ে শিক্ষার্থীরা ডিন বরাবর লিখিত আবেদন করলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষিকা বিষয়টিকে ব্যক্তিগতভাবে গ্রহণ করে সেই শিক্ষার্থীদের ওপর পরবর্তী সেমিস্টারগুলোতে ‘পানিশমেন্ট’ বা মানসিক হেনস্তার খড়গ নামিয়ে আনেন। তবে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ও শিক্ষকতার মহান পেশাকে কলঙ্কিত করার মতো অভিযোগটি হলো, আফসানা মেহেরুন আইনির বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলনের গুরুতর অভিযোগ।
বিভিন্ন সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে রিসোর্টে সময় কাটানোসহ অসামাজিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকার অভিযোগে তার পারিবারিক জীবনে ভাঙন ধরেছে বলে জানা গেছে। তিনি তার স্বামীর সঙ্গে সংসার করা অবস্থায় ইতালি চলে যান এবং সেখানে গিয়ে একজন ইতালিয়ান নাগরিকের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন এবং তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা হয়ে দেশে ফিরেন। প্রবাস থেকে ফিরে স্বামীর সঙ্গে থাকা অবস্থাকালীন সেই সন্তানটি নষ্ট করে দেন। এই ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ড মেনে নিতে না পারায় তার স্বামী প্রতিবাদ জানালে তিনি স্বামীর বিরুদ্ধে আদালতে মিথ্যা ১০ লক্ষ টাকার একটি যৌতুক মামলা দায়ের করেন, যার সি আর মামলা নং-৬৬৭/২০২৫ এবং পরবর্তীতে ই-মেইলের মাধ্যমে তার স্বামীকে তালাকপত্র পাঠান।
একজন শিক্ষকের এমন ব্যক্তিগত ও নৈতিক জীবন নিয়ে অভিভাবকরাও রীতিমতো শঙ্কিত। অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন—মানুষ গড়ার কারিগর যদি এমন নৈতিক অবক্ষয়ের শিকার হন, তবে তার কাছ থেকে শিক্ষার্থীরা কী শিখবে? এদিকে প্রক্টোরিয়াল টিমের অভিযুক্ত শিক্ষক রাকিবুল ইসলাম সিফাত, সাব্বির আহমেদ আবির ও শিক্ষিকা ফারহানার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তবে প্রশাসনের আশ্বাস ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে বিস্তর ফারাক লক্ষ্য করা গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জান্নাতুল ফেরদৌস (ছদ্মনাম) নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, বিইউএফটির মতো একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে এমন অরাজকতা চলতে থাকলে উচ্চশিক্ষার পরিবেশ বিনষ্ট হবে এবং আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হবে। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ও সচেতন অভিভাবকরা দ্রুত এই ‘ক্ষমতার বলয়’ ভেঙে স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন, অন্যথায় তারা বৃহৎ আন্দোলনের ডাক দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বিইউএফটি কর্তৃপক্ষ কি শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের আস্থার মর্যাদা রাখবে, নাকি দুর্নীতিগ্রস্ত চক্রের কাছেই নতি স্বীকার করবে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।