কামরুল ইসলাম:
চট্টগ্রাম নগরীতে বিশেষ অভিযান চালিয়ে থানা থেকে লুট হওয়া বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র, সাবমেশিনগান (এসএমজি) ও বিপুল পরিমাণ গুলিসহ শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদ গ্রুপের তিন সহযোগীকে গ্রেপ্তার করেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। এ সময় তাদের কাছ থেকে একটি বিদেশি রিভলভার, একটি ব্রাজিলিয়ান টরাস ৯ এমএম পিস্তল, একটি সাবমেশিনগান (এসএমজি), দুটি ম্যাগাজিন, বিপুল পরিমাণ গুলি এবং একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়।
সোমবার দিবাগত রাত থেকে মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। মঙ্গলবার রাতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সিএমপি এ তথ্য নিশ্চিত করে।
পুলিশ জানায়, সিএমপি কমিশনার হাসিব আজিজের নির্দেশনায় এবং অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) ওয়াহিদুল হক চৌধুরীর নেতৃত্বে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে প্রথমে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী মোহাম্মদ আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী ওরফে রিমন ওরফে ইমনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে চকবাজার থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে একটি থ্রি-টু বোরের বিদেশি রিভলভার ও ৯ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার হওয়া রিভলভার ও গুলি সিএমপির পাহাড়তলী থানা থেকে লুট করা হয়েছিল বলে নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ।
পুলিশ আরও জানায়, গ্রেপ্তারকৃত আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বহদ্দারহাটে সংঘটিত আলোচিত ৮ হত্যা মামলার যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি। ওই মামলাটি চান্দগাঁও থানায় দায়ের করা হয়েছিল (মামলা নং–০৮(০৭)২০০০, ধারা– ৩০২/১০৯/৩৪ পেনাল কোড)। তিনি দীর্ঘদিন ধরে শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদ গ্রুপের অন্যতম সক্রিয় সদস্য হিসেবে কাজ করে আসছিলেন।
ইমনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে উপ-পুলিশ কমিশনার (উত্তর) ও পাঁচলাইশ থানার ওসির নেতৃত্বে আরেকটি দল পাঁচলাইশ থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে মনির নামের আরেক সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে। এ সময় তার কাছ থেকে একটি ব্রাজিলিয়ান টরাস ৯ এমএম পিস্তল এবং একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানায়, উদ্ধার হওয়া পিস্তলটিও সিএমপির ডবলমুরিং থানা থেকে লুট করা হয়েছিল।
পরে মনিরের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ভোরে বায়েজিদ বোস্তামী থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে তার সহযোগী সায়েমকে গ্রেপ্তার করা হয়। সায়েমের দেখানো মতে খুলশী থানা এলাকায় তল্লাশি চালিয়ে একটি সাবমেশিনগান (এসএমজি), দুটি ম্যাগাজিন এবং ৫০ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সায়েম পুলিশকে জানায়, এসব অস্ত্র খাগড়াছড়ির পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের কাছ থেকে কেনা হয়েছিল।
পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তারকৃত মনির ও সায়েমের বিরুদ্ধে খুন, ডাকাতি, চাঁদাবাজি ও অস্ত্র আইনে মোট ১০টি মামলা রয়েছে। তারা দীর্ঘদিন ধরে বড় সাজ্জাদ গ্রুপের সক্রিয় সদস্য হিসেবে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল।
এদিকে গ্রেপ্তারকৃত আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীর কাছ থেকে সাজ্জাদ গ্রুপের নতুন সদস্য নিয়োগের শপথ গ্রহণ সংক্রান্ত একটি ভিডিও ক্লিপও উদ্ধার করা হয়েছে। ওই ভিডিওতে দেখা যায়, নতুন সদস্যদের অস্ত্রধারণ ও সন্ত্রাসী কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার শপথ করানো হচ্ছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বড় সাজ্জাদ গ্রুপ চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজি, খুন, ডাকাতি ও বালুমহাল নিয়ন্ত্রণের জন্য দীর্ঘদিন ধরে সশস্ত্র তৎপরতা চালিয়ে আসছে। গ্রেপ্তার হওয়া আসামিরা সাজ্জাদের নির্দেশেই এসব কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে অংশ নিত।
পুলিশ আরও জানায়, সম্প্রতি চন্দনপুরা এলাকায় স্মার্ট গ্রুপের মালিকের বাড়িতে সংঘটিত গুলির ঘটনায় প্রধান পরিকল্পনাকারী ও সমন্বয়কারী ছিলেন আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী। তিনি পর্দার আড়াল থেকে সাজ্জাদ গ্রুপের অস্ত্রভান্ডার পরিচালনা, চাঁদাবাজি ও হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করতেন বলেও প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃত আসামিরা স্বীকার করেছে যে, উদ্ধার করা তিনটি আগ্নেয়াস্ত্র চন্দনপুরার ওই গুলির ঘটনায় ব্যবহার করা হয়েছিল। তবে বিষয়টি নিশ্চিত হতে অস্ত্রগুলো ব্যালিস্টিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ আরও জানায়, গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের অন্য সহযোগীদের গ্রেপ্তার এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
অন্যদিকে ডিবি (পশ্চিম) পুলিশের নেতৃত্বে পবিত্র মাহে রমজান ও ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে ছিনতাইকারী গ্রেপ্তারে বিশেষ অভিযান চালানো হয়েছে। অভিযানের সময় কোতোয়ালী থানা এলাকা থেকে পেশাদার ছিনতাইকারী চক্রের তিন সদস্য— মারুফ হোসেন তুষার (২১), মোহাম্মদ বাবু (২৭) এবং মেহেদী হাসান ওরফে হাসান (২২) কে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তারকৃতদের কাছ থেকে একটি ধামা এবং একটি ছোরা উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে কোতোয়ালী থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।
পুলিশের তথ্যমতে, গ্রেপ্তারকৃত মোহাম্মদ বাবুর বিরুদ্ধে ডাকাতির প্রস্তুতি, চুরি ও ছিনতাইয়ের ৬টি মামলা রয়েছে। মারুফ হোসেন তুষারের বিরুদ্ধে চুরি ও ছিনতাইয়ের ২টি মামলা এবং মেহেদী হাসান ওরফে হাসানের বিরুদ্ধে ডাকাতির প্রস্তুতি, চুরি ও ছিনতাইয়ের ৬টি মামলা রয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, রমজান ও ঈদকে কেন্দ্র করে নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সন্ত্রাসী ও ছিনতাইকারীদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।