রাজধানীর লক্ষীবাজারে ৮ তলা অনুমোদিত ভবন হয়ে গেল ১১ তলা, দেখেও দেখছেন না পরিদর্শক মুরাদ

মিজানুর রহমান:

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)-এর জোন ৭/৩–এর দায়িত্বপ্রাপ্ত ইমারত পরিদর্শক আল নাঈম মুরাদের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ এবং অবৈধ নির্মাণকাজে সহায়তা করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, একাধিক নির্মাণ প্রকল্পে অনুমোদিত নকশা ও ইমারত বিধিমালা লঙ্ঘন করা হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বারবার অভিযোগ জানানো সত্ত্বেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সম্প্রতি তার বদলি হলেও এসব অভিযোগের ধারা থামেনি বলে অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসী।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, পুরান ঢাকার লক্ষীবাজার এলাকার ৩ নম্বর কে.জি. গুপ্ত দাস লেনের মাত্র ৮ ফুট প্রশস্ত সড়কের পাশে একটি ভবনের জন্য রাজউক থেকে ৮ তলা ভবনের অনুমোদন থাকলেও সেখানে প্রায় সাড়ে ১১ তলা পর্যন্ত নির্মাণকাজ চালানো হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযুক্ত ইমারত পরিদর্শক আল নাঈম মুরাদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ভবন কর্তৃপক্ষ এই অতিরিক্ত তলা নির্মাণ করে যাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে এলাকাবাসী একাধিকবার অভিযোগ করলেও দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

উল্লেখ্য, ভবনটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী সাগর অতীতে আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ৫ আগস্টের পর তিনি দীর্ঘদিন কারাবন্দি ছিলেন বলেও জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, তার তত্ত্বাবধানে নির্মাণকাজে অনুমোদিত নকশা উপেক্ষা করে নিজস্ব খেয়ালখুশি অনুযায়ী কাঠামোগত পরিবর্তন আনা হয়েছে, যা রাজউকের ইমারত নির্মাণ বিধিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, ইমারত নির্মাণ আইন অনুযায়ী জমির অন্তত ৪০ শতাংশ খোলা জায়গা রাখার বাধ্যবাধকতা থাকলেও বাস্তবে তা মানা হয়নি। পাশাপাশি নির্মাণস্থলে রাজউকের অনুমোদন বোর্ডও টানানো হয়নি, যা নিয়মবহির্ভূত। ফলে এলাকাবাসীর মধ্যে ভবনের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, রাজউক জোন ৭/৩–এর আওতাধীন গেন্ডারিয়ার ৩৪ নম্বর দ্বীন নাথ সেন রোডে মাত্র ৪ ফুট প্রশস্ত রাস্তায় ঝুঁকিপূর্ণ ১০ তলা ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া সূত্রাপুরের মালাটোলা এলাকার ৪৭/১ নম্বর প্লট, ১৪৭ ডিস্টিলারি রোড, ১৫৩/২ ডিস্টিলারি রোড, ৬ নম্বর হেমন্ত দাস লেন (২ কাঠা জায়গায় ১১ তলা), ২৮/২ দ্বীন নাথ সেন রোড, ৮ নম্বর দ্বীন নাথ সেন রোড, ১ নম্বর নন্দশাহ রোড, ৮৮/এ/২ ডিস্টিলারি রোড, ৩৫ মালাকাটোলা এবং ১৪ নম্বর রজনী চৌধুরী রোড এলাকায়ও অনুমোদিত নকশা লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, এসব এলাকায় মাত্র ৪ থেকে ৬ ফুট প্রশস্ত সরু রাস্তায় ১০ থেকে ১১ তলা পর্যন্ত বহুতল ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে, যা নগর পরিকল্পনা এবং জননিরাপত্তার জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে। অগ্নিকাণ্ড বা অন্য কোনো দুর্ঘটনার সময় এসব ভবনে ফায়ার সার্ভিস বা উদ্ধারকারী যানবাহনের প্রবেশ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে বলেও আশঙ্কা করছেন তারা।

স্থানীয় সূত্রের দাবি, এসব নির্মাণ প্রকল্পে অনিয়ম থাকা সত্ত্বেও আল নাঈম মুরাদ কার্যত কোনো ব্যবস্থা নেননি। অভিযোগ রয়েছে, মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে তিনি অনুমোদিত নকশা লঙ্ঘনের বিষয়গুলো উপেক্ষা করে গেছেন। কয়েকজন ভবন মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “জলে বাস করে কুমিরের সঙ্গে লড়াই করা যায় না, তাই বাধ্য হয়ে ম্যানেজ করেই কাজ করতে হয়।”

কয়েকজন সাংবাদিকের কাছেও ঘুষ লেনদেন সংক্রান্ত অডিও ও ভিডিও প্রমাণ রয়েছে বলে জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, একটি দালাল চক্রের মাধ্যমে এই ঘুষ লেনদেন পরিচালিত হয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে তা পৌঁছে দেওয়া হয়।

স্থানীয় সূত্রে আরও জানা যায়, ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াকালীন সময় থেকেই আল নাঈম মুরাদ ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে এক প্রভাবশালী সংসদ সদস্যের সুপারিশে ২০১৫ সালে তিনি রাজউকে ইমারত পরিদর্শক পদে যোগ দেন।

এ ঘটনায় এলাকাজুড়ে চরম ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। একাধিক নাগরিক সংগঠন বলছে, রাজউকের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ নগর পরিকল্পনা ও নাগরিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তারা অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে রাজউকের বর্তমান ইমারত পরিদর্শক রাফিউল ইসলাম বলেন, তিনি নতুন করে দায়িত্ব পেয়েছেন এবং জোনের প্রতিটি অবৈধ নির্মাণ চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে বাস্তবে কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয় বলে মনে করছেন এলাকাবাসী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *