মোহাম্মদ হোসেন হ্যাপী:
নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের ১৮নং ওয়ার্ডের শীতলক্ষ্যা পাওয়ার হাউস সংলগ্ন বোগদাদী নগরে যথাযোগ্য ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, আধ্যাত্মিক পরিবেশ ও ভক্ত-আশেকানদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে সম্পন্ন হয়েছে সুলতানুল আউলিয়া হযরত মাওলানা সৈয়দ শামসুদ্দিন শাহ্ বোগদাদী (রঃ)-এর ৭২তম তিন দিনব্যাপী বাৎসরিক উরশ মোবারক। সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) ফ্রি চক্ষু চিকিৎসা কার্যক্রম ও আখেরী মোনাজাতের মাধ্যমে এ বরকতময় আয়োজনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।
প্রতিবছর ১ ফাল্গুন থেকে ৮ ফাল্গুন পর্যন্ত উরশ মোবারক অনুষ্ঠিত হলেও পবিত্র মাহে রমজান সন্নিকটে থাকায় এ বছর কর্মসূচি সংক্ষিপ্ত করে তিন দিনে সীমিত রাখা হয়। তবে সংক্ষিপ্ত আয়োজনেও ভক্তদের উপস্থিতিতে পুরো দরবার প্রাঙ্গণ ছিল প্রাণচঞ্চল ও মুখরিত।
গিলাফ চড়ানোর মাধ্যমে শুভ সূচনা
১লা ফাল্গুন, শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) দুপুর ১২টা ০১ মিনিটে গিলাফ চড়ানোর মধ্য দিয়ে উরশের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। পরে বাদ এশা ওয়াজ ও মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। এতে স্থানীয় ওলামায়ে কেরাম পবিত্র কুরআন ও হাদিসের আলোকে আধ্যাত্মিক জীবন গঠনের গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং ওলিদের আদর্শ অনুসরণের আহ্বান জানান।
দ্বিতীয় দিন, রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) বাদ এশা মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়। রাত ১০টায় সামা কাওয়ালীর পরিবেশনায় ভক্তবৃন্দ আধ্যাত্মিক আবহে মগ্ন হয়ে পড়েন। পুরো পরিবেশ ছিল ইবাদত, জিকির-আযকার ও ধর্মীয় আলোচনায় পরিপূর্ণ।
ফ্রি চক্ষু চিকিৎসা কার্যক্রমে উপকৃত শতাধিক মানুষ
উরশের তৃতীয় ও শেষ দিন সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) দরবার প্রাঙ্গণে বিনামূল্যে চক্ষু চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এতে এলাকার অসহায় ও দুস্থ মানুষের মাঝে চোখের পরীক্ষা, প্রাথমিক চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান করা হয়। আয়োজকদের তথ্য মতে, শতাধিক মানুষ এ সেবার আওতায় উপকৃত হয়েছেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ নূর কুতুবুল আলম। তিনি বলেন, “এ মহতি উরশ উপলক্ষে ফ্রি চক্ষু চিকিৎসা কার্যক্রমে উদ্বোধক হিসেবে অংশ নিতে পেরে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করছি। ধর্মীয় আয়োজনকে মানবসেবার সঙ্গে সম্পৃক্ত করার এ উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে উন্নয়নমূলক কাজে সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।”
তিনি উচ্চবিত্ত এলাকাবাসীর প্রতি ধর্মীয় ও মানবকল্যাণমূলক কার্যক্রমে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান এবং ফ্রি চক্ষু চিকিৎসা কার্যক্রমে সহযোগিতার জন্য মা চক্ষু হাসপাতালের কর্ণধার মোঃ আলমগীর হোসেনকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান।
আখেরী মোনাজাতে দেশ ও জাতির কল্যাণ কামনা
সোমবার বাদ এশা আখেরী মোনাজাতের মাধ্যমে উরশের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। আখেরী মোনাজাত পরিচালনা করেন দরবার শরীফের মোতায়াল্লী ও পরিচালক, গদীনিশিন খাদেমুল গোলাম মোহাম্মদ হোসাইন হ্যাপী। মোনাজাতে দেশ, জাতি ও সমগ্র মুসলিম উম্মাহর শান্তি, সমৃদ্ধি ও কল্যাণ কামনা করা হয়। আবেগঘন পরিবেশে হাজারো ভক্ত এতে অংশ নেন।
গদীনিশিন খাদেমুল গোলাম মোহাম্মদ হোসাইন হ্যাপী বলেন, প্রতিবছরের ধারাবাহিকতায় যথাযোগ্য মর্যাদা, শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে উরশ পালনের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। রমজান ঘনিয়ে আসায় সময় বিবেচনায় কর্মসূচি তিন দিনে সীমিত রাখা হলেও আয়োজনের ধর্মীয় মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখা হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতেও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভক্তবৃন্দ এ উরশে অংশগ্রহণ করবেন।
সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও সহযোগিতা
আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, উরশ উপলক্ষে দরবার প্রাঙ্গণে আলোকসজ্জা, আগত ভক্তদের বসার সুব্যবস্থা, নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। দেশ-বিদেশের অসংখ্য আশেকান প্রতিবছর এ উরশে অংশ নিয়ে থাকেন।
সার্বিক সহযোগিতায় ছিল কাশ্তি ফাউন্ডেশন। সাবেক বাটা কোম্পানি মাঠ (বর্তমান পাওয়ার হাউস সংলগ্ন এলাকা), বোগদাদী নগর, শীতলক্ষ্যায় এ বরকতময় উরশ মোবারক অনুষ্ঠিত হয়।
উল্লেখ্য, হযরত মাওলানা সৈয়দ শামসুদ্দিন শাহ্ বোগদাদী (রঃ)-এর আদর্শ, ত্যাগ ও মানবসেবামূলক শিক্ষা প্রচারের লক্ষ্যে প্রতিবছর এ উরশের আয়োজন করা হয়, যা ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সামাজিক ঐক্য জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে।