আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গাফিলতি, রোহিঙ্গাদের যাতায়াতে নানামুখী অপরাধ

আব্দুল গফুর:


উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বিভিন্ন মোড়, বাজার ও রাস্তায় অসংখ্য চেকপোস্ট স্থাপন করা হলেও রোহিঙ্গারা এগুলো অতিক্রম করে নির্বিঘ্নে লোকালয়ে প্রবেশ করছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা রক্ষায় দায়িত্বপ্রাপ্ত আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) উপস্থিত থাকলেও কার্যকর ভূমিকা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে।

প্রতিদিনই বাজার, পরিবহন ও বিভিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্যে রোহিঙ্গাদের সক্রিয় উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। অনেকে লোকালয়ে বাসা ভাড়া নিয়ে জড়াচ্ছে নানা অপরাধে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঝে মাঝে তাদের আটক করলেও পরিস্থিতি তেমন বদলায়নি। এই দীর্ঘায়িত সমস্যা, রোহিঙ্গা সংকট ও অপরাধ বৃদ্ধির কারণে সামাজিক ও নিরাপত্তা জনিত সমস্যা দেখা দিয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, চেকপোস্টে দায়িত্বে থাকা কিছু পুলিশ সদস্যের উদাসীনতা ও অবহেলার কারণে রোহিঙ্গারা নির্বিঘ্নে চলাচল করছে। চুরি, ছিনতাই, মাদক ব্যবসাসহ বিভিন্ন অপরাধ বাড়ছে।

সরাসরি মাঠ পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের সামনে দিয়েই রোহিঙ্গারা অবাধে যাতায়াত করছে। থামানো বা তল্লাশির উদ্যোগ নেওয়া হয় না। এতে নিরাপত্তা ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডও বেড়েছে।

রোহিঙ্গারা শুধু ক্যাম্পে সীমাবদ্ধ নয়; ব্যবসা-বাণিজ্যেও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। কেউ কেউ স্থানীয়ভাবে ট্রেড লাইসেন্সও সংগ্রহ করেছে, কেউ সড়কে গাড়িও চালাচ্ছে, যার অধিকাংশের বৈধ লাইসেন্স বা ফিটনেস নেই। কুতুপালং ও বালুখালী এলাকায় এই চিত্র চোখে পড়েছে।

স্থানীয় সূত্র বলছে, রোহিঙ্গাদের অপরাধ প্রবণতা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। মাদক ব্যবসা, অপহরণ, খুন, অস্ত্র ও মানবপাচার—সব ক্ষেত্রে রোহিঙ্গা সিন্ডিকেট সক্রিয়। প্রায় প্রতিদিনই উখিয়া ও টেকনাফে এই ধরনের অপরাধের খবর পাওয়া যাচ্ছে, তবু কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যায়নি।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, চেকপোস্ট কাগজে ঠিকই আছে, বাস্তবে দায়িত্বে থাকা সদস্যদের তৎপরতা কম। রোহিঙ্গারা দল বেঁধে লোকালয়ে যাচ্ছে, ব্যবসা করছে, অপরাধ সংঘটিত করলেও নির্বিঘ্নে ফিরে যাচ্ছে। খিয়া রাজাপালং ইউনিয়নের ইউপি সদস্য হেলাল উদ্দিন বলেন, “রোহিঙ্গারা এখন অবাধে চলাফেরা করছে, যেন এ দেশই তাদের। চেকপোস্টে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসতে পারতো।”

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ১৪ এপিবিএন পুলিশের এক কর্মকর্তা স্বীকার করেন, “রোহিঙ্গা জনসংখ্যা বেশি এবং প্রবেশপথ অসংখ্য হওয়ায় শতভাগ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হচ্ছে না।”

১৪ এপিবিএন-এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জানে আলম বলেন, “রোহিঙ্গাদের চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও তল্লাশির জন্য চেকপোস্ট স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু নানা অজুহাতে তারা অনেক সময় পার হয়ে যায়। এখন কার্যকর ও বড় উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।”

৮-এপিবিএন পুলিশের অধিনায়ক (অতিরিক্ত ডিআইজি) রিয়াজ উদ্দিন রিয়াজ বলেন, “চেকপোস্টে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের নির্দেশ দেওয়া আছে। তবে কিছু পুলিশ সদস্যের গাফিলতির কারণে সমস্যা দেখা দেয়। প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ইতোমধ্যে অনেককে ক্লোজ করা হয়েছে। আমরা চাই পুলিশ সর্বত্র আরও কার্যকর ভূমিকা রাখুক।”

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, চেকপোস্ট কার্যকর না হলে বা দায়িত্বে অবহেলা থাকলে রোহিঙ্গাদের অপরাধ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়বে। তারা মনে করছেন, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি ও আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় জোরদার করা এখন সময়ের দাবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *