আদালতের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে রফেজ হাওলাদার গং কর্তৃক সাইনবোর্ড খুলে ফেলার অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক:

জমি নিয়ে দু’পক্ষের মধ্যে চলতে থাকা বিবাদের অবসান না হওয়ার পূর্বে আদালতের স্টে-অর্ডার অমান্য করে মো. ইকরামুল হক গং-এর পক্ষে মো. নজরুল ইসলামের সাইনবোর্ড খুলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে রফেজ হাওলাদার গং-এর বিরুদ্ধে। ঘটনাটি ঘটেছে বাসাবো রাজারবাগ এলাকায় ২২ ফেব্রুয়ারি। তথ্যমতে জানা যায়, রফেজ হাওলাদার স্ত্রী সেফালী বেগম, ছেলে হৃদয় হাওলাদার দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন ঢাকা, স্বেচ্ছাসেবক দলের নাম ব্যবহার করে নেতা ওমর ফারুকের নাম ভাঙিয়ে, গত ২২/০২/২০২৬ তারিখে আদালতের আদেশ অমান্য করে কতিপয় সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে প্রশাসনের সহযোগিতায় একরামুল গং-এর সাইনবোর্ড তুলে ফেলেন। এমনকি এলাকার কতিপয় সন্ত্রাসীদের নিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়।

ভুক্তভোগী সূত্রে জানা যায়, গত ১৪/০১/২০২৬ ইং তারিখে ঢাকা সিভিল জজ আদালত নং ১৪-তে বাদীপক্ষ ইকরামুল হক গং একটি দেওয়ানী মামলা করে, যার মোকদ্দমা নং ০২/২০২৬। আদালত বাদীর পক্ষে নির্দেশ প্রদান করে যাতে বেদখল বা হস্তান্তর না করতে পারে এবং ভূমির আকৃতি ও প্রকৃতি পরিবর্তন করতে না পারে। আদালত শোকজ আদেশ প্রদান করে। এর তফসিল ঢাকা জেলার, থানা সবুজবাগ ও সাব-রেজিস্টার অফিস খিলগাঁও।

জেএল নং সিএস-২৮৬, এসএ নং ১০, আরএস নং ০৩, ঢাকা সিটি জরিপে ৭ নং মৌজার রাজারবাগ। খতিয়ান নং সিএস নং-৬৩, এসএ ৭৭৫, আরএস-২০৩০, ঢাকা সিটি জরিপে ২২৬৫৮ নং খতিয়ানে লিখিত। দাগ নং সিএস-১০৬৩, এসএ নং ২০৭৬ ও ২০৭৭, আরএস ১০০২৯ ও ১০০৩০ ঢাকা সিটি জরিপে ৭৩৯৪ নং দাগে ১ ষোল আনার ৫৫ শতাংশ সম্পত্তি। উত্তরে সাইদুল হক, দক্ষিণে আবু হেনা গং, পূর্বে সরকারি রাস্তা ও পশ্চিমে আব্দুল খালেক গং।

শুধু এই একটি ঘটনাই নয়, অভিযুক্ত রফেজ হাওলাদার সম্পত্তির মালিক মো. সাইদুল হক গং-সহ বহু ব্যক্তির কাছ থেকে আমোক্তার নিয়ে প্রতারণামূলকভাবে সম্পত্তি বিক্রি করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তথ্যমতে মান্ডা নিবাসী আবুল কালাম আজাদ গং-এর ১০৬৫ নং দাগের ৯০ শতক জমি ভুয়া দলিল করে আত্মসাৎ করা হয়েছে। এছাড়াও রাজারবাগ মৌজার শাহজাহানপুরের বেনজিরের সম্পত্তি দলিল জালিয়াতি করে রফেজ ও বারেক হাওলাদার আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি শামীমের কাছে হস্তান্তর করেছেন।

রফেজ হাওলাদার দলিল জালিয়াতি করে সাইনবোর্ড দিয়ে প্রশাসনের বিভিন্ন শাখার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৩০ জন অফিসারের কাছে হস্তান্তর করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সূত্র জানায়, মো. সাইদুল হক গং-এর বাবা আব্দুল হক ১৯৬৪ সালে ঢাকার সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ৩৪৮২ নং সাব-কবলা মূলে সম্পত্তিটি ক্রয় করেন। পরে মো. সাইদুল হক গং-এর নামে এসএ নামজারি হয়। কিন্তু বিগত আরএস জরিপের সময় নালিশী তফসিল সম্পত্তি আরএস ২০৩০ নং খতিয়ানে ভুলক্রমে লক্ষ্মীনারায়ণ দে সরকার গং-এর নামে হাল সংরক্ষিত হয়।

বাংলাদেশ সরকারের নামে এই রেকর্ডের বিরুদ্ধে মো. সাইদুল হক গং ঢাকা ৪র্থ সহকারী জজ আদালতে দেওয়ানী মোকদ্দমা নং ৪৯/২০০১১ দায়ের করেন। ২০১২ সালে নালিশের সম্পত্তি অর্পিত সম্পত্তি ‘ক’ তালিকায় প্রকাশিত হলে উক্ত দেওয়ানী মোকদ্দমা অ্যাবেট হয়। পরে মো. সাইদুল হক গং ঢাকা জেলা জজ অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যার্বন ট্রাইব্যুনালে মোকাদ্দমা নং ১৯৪০/১২ দায়ের করে, ১৯/১১/২০১৯ তারিখে রায় ও ডিক্রি লাভ করেন।

রফেজ হাওলাদার মামলা-মোকদ্দমা পরিচালনার জন্য আমোক্তারনামা করে প্রতারণামূলকভাবে উক্ত আমোক্তার হস্তান্তর বিষয় লেখেন। রফেজ হাওলাদার ০৪/১০/২০১৮ তারিখের আমোক্তার বলে ১১/১১/২৪ ইং তারিখে ১১২৯৫ সাব-কবলা দলিলমূলে ৪৯৫ অযুতাংশ সম্পত্তি জাহাঙ্গীরের নিকট বিক্রি করে এবং একই তারিখে ১১২৯৬ নং সাব-কবলা দলিলমূলে জাহাঙ্গীর রফেজ হাওলাদারের স্ত্রী সেফালী বেগমের নিকট বিক্রি করে।

ভূমিখেকো রফেজ হাওলাদারের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি দলিল জালিয়াতি করে প্রতারণামূলকভাবে আমোক্তারনামা নিয়ে সম্পত্তি হস্তান্তর এবং ভুয়া দলিল তৈরি করে সম্পত্তি বিক্রি করেছেন। ইতোমধ্যে তিনি হয়ে উঠেছেন এক অপ্রতিরোধ্য ভূমিদস্যুতে। তার প্রতারণায় বহু পরিবার নিস্ব ও অসহায় জীবনযাপন করছে। তার বিরুদ্ধে থানায় রয়েছে বিস্তর অভিযোগ।

মো. সাইদুল হক গং-এর পক্ষ থেকে জালজালিয়াতির মাধ্যমে ৫৫ শতাংশ বিবাদমান জমি দখল করে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কাছে বিক্রি করায় রফেজ হাওলাদারের বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা দায়ের করা হয়েছে। ০৪/১০/২০১৮ তারিখের ৮১৮৬ নং রেজিস্টার্ড আমোক্তার দলিল বাতিলের বিষয়ে সহকারী জজ ৪র্থ আদালত ঢাকা মামলা নং ৬৬/২০২০ দায়ের করেন। সহকারী জজ আদালত ৪র্থ আদালত বিগত ২৬/০১/২০২৫ তারিখে ৮১৮৬ নং রেজিস্টার্ড আমোক্তার দলিল বাতিল করেন। পরবর্তীতে ১৬/০২/২০২৫ তারিখে ২৩ নং স্বারকে খিলগাঁও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে প্রেরণ করা হয়।

জানা যায়, ২৬/০১/২০২৫ ইং তারিখে সাইদুল হক গং কর্তৃক সম্পাদিত ০৪/১০/২০১৮ ইং ৮১৮৬ নং দলিল বাতিলের পর বিজ্ঞ সিভিল জজ আদালত নং ১৪, ঢাকা চিরস্থায়ী মোকদ্দমা নং ০২/২৬ বিচারাধীন থাকার সময় মহাপরিদর্শক নিবন্ধন (আইজিআর) বরাবরে সকল প্রকার দলিল ও নিবন্ধন স্থগিত করার জন্য ১৩/০১/২০২৬ তারিখে আবেদন করেন।

এলাকাবাসী রফেজ হাওলাদারকে কুখ্যাত ভূমিদস্যু হিসেবে জানেন। তার বিরুদ্ধে কথা বললেই বিভিন্ন হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলার ভয় দেখিয়ে ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসরদের প্রভাব খাটিয়ে সাধারণ মানুষের জিম্মি করে রাখে। তার জালিয়াতি করার মাধ্যমে বিভিন্ন মানুষের জমি দখল করা তার নেশা ও পেশা বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

বীরমুক্তিযোদ্ধা সাইদুল হক গগার সাথে কথা হয়, তিনি বলেন, “আমরা একসময় রফেজ হাওলাদারকে আমোক্তার নিয়োগ দিয়েছিলাম, কিন্তু পরবর্তীতে যখন জানতে পারি সে একজন প্রতারক, জালিয়াতি ও ঠকপ্রকৃতির লোক, তখন প্রদেয় আমোক্তারনামা প্রত্যাহার করি। তারপরও সে থামেনি, নিজের নামে ভুয়া দলিল বানিয়ে স্ত্রীর নামে দলিল দেয়। স্ত্রী আবার পুলিশসহ বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে বিক্রি করে। তার এহেন কাজের ফলে বহু লোক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।”

যে জমিতে আদালত স্টে-অর্ডার দিয়েছেন, সেখানে সাইনবোর্ড স্থাপন করলে রফেজ হাওলাদার যুবদলের কতিপয় নেতাদের নিয়ে রাতের আধারে ওই সাইনবোর্ড খুলে ফেলে। এমনকি কয়েকদিন আগে আমাদের বর্তমান আমোক্তার মো. নজরুল ইসলামের নামে সবুজবাগ থানায় ২১/০১/২০২৬ ইং তারিখে একটি ডায়েরি দায়ের করেন, নম্বর ১৪২৪। এতে উল্লেখ করা হয়, নজরুল ইসলাম ও তার লোকজন দিয়ে শেফালী বেগম ও তার স্বামীকে ভয়ভীতি দেখিয়ে এলাকা ছাড়তে বলছে, যা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট।

ভুক্তভোগী আবুল কালাম আজাদ বলেন, “১০৬৫ নং দাগের ৯০ শতাংশ জমি জালিয়াতির মাধ্যমে বিক্রি হয়েছে। আমরা এই প্রতারকের কবল থেকে মুক্তি চাই।”

এলাকাবাসী রফেজ হাওলাদারকে একজন কুখ্যাত ভূমিদস্যু হিসেবে পরিচিত উল্লেখ করেছেন। তার বিরুদ্ধে কথা বললেই হয়রানিমূলক মামলা ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর ভয় দেখানো হয়। বহু পরিবার তার প্রতারণার শিকার হয়ে নিঃস্ব ও অসহায় হয়ে পড়েছে। ভুক্তভোগীরা সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কাছে দ্রুত তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *