ইন্দুরকানীতে দায়িত্বকালেই খাদ্য নিয়ন্ত্রক মামুনুর রশীদের বিরুদ্ধে একাধিক অনিয়মের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক:

পিরোজপুরের ইন্দুরকানী (জিয়ানগর) উপজেলায় খাদ্য নিয়ন্ত্রক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে মামুনুর রশীদের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর প্রশাসনিক অনিয়ম ও দায়িত্বহীনতার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে—বরাদ্দ ছাড়াই সরকারি বাসা দখল করে বসবাস, লক্ষাধিক টাকার সরকারি রাজস্ব ফাঁকি, ভিজিএফ (ভালনারেবল গ্রুপ ফিডিং) কর্মসূচির আওতায় নিম্নমানের ও পচা চাল বিতরণ এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার।

স্থানীয় সূত্র ও প্রশাসনিক নথি অনুযায়ী, মামুনুর রশীদ ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে ইন্দুরকানী উপজেলায় খাদ্য নিয়ন্ত্রক হিসেবে যোগদান করেন। দায়িত্ব গ্রহণের কয়েক মাসের মধ্যেই তার বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসতে শুরু করে, যা এখন স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বরাদ্দ ছাড়াই সরকারি বাসা দখল, রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ

অভিযোগ রয়েছে, ২০২৫ সালের মার্চ মাস থেকে মামুনুর রশীদ কোনো বৈধ বরাদ্দ ছাড়াই উপজেলা চত্বরে অবস্থিত চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের জন্য নির্ধারিত ডরমিটরিতে বসবাস শুরু করেন। এ বিষয়ে উপজেলা বাসভবন বরাদ্দ কমিটি একাধিকবার মৌখিক ও লিখিতভাবে তাকে বিষয়টি নিষ্পত্তির অনুরোধ জানালেও তিনি কোনো ব্যবস্থা নেননি বলে অভিযোগ।

ফলে সরকারি বাসা ব্যবহারের বিপরীতে প্রাপ্য ভাড়া ও অন্যান্য চার্জ পরিশোধ না করায় লক্ষাধিক টাকার রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়েছে বলে ধারণা স্থানীয়দের। বিষয়টি প্রশাসনিক শৃঙ্খলা লঙ্ঘনের পাশাপাশি সরকারি সম্পদের অপব্যবহারের শামিল বলে মন্তব্য করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ভিজিএফ কর্মসূচিতে পচা ও নিম্নমানের চাল বিতরণের অভিযোগ

মামুনুর রশীদের দায়িত্বকালেই ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় চাল বিতরণ নিয়ে গুরুতর অভিযোগ ওঠে। ২০২৫ সালের জুন মাসে ইন্দুরকানী উপজেলার পত্তাশী ইউনিয়নে সরকারি খাদ্য গুদাম থেকে উপকারভোগীদের মাঝে নিম্নমানের ও পচা চাল বিতরণ করা হয় বলে অভিযোগ করেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

ভুক্তভোগীদের দাবি, দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্য বরাদ্দকৃত এই চাল রান্নার অযোগ্য ছিল এবং দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল। তারা জানান, এ বিষয়ে অভিযোগ জানালেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। যদিও সরাসরি মামুনুর রশীদের বিরুদ্ধে চাল সরবরাহে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তবে তার দায়িত্বকালে এ ধরনের ঘটনা ঘটায় স্থানীয়রা তার তদারকি ও দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।

উল্লেখ্য, একই ধরনের ভিজিএফ চাল বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ এর আগে ঝালকাঠি সদর উপজেলাতেও উঠেছিল, যা খাদ্য বিভাগের সার্বিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

সাংবাদিকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনা

এদিকে সাংবাদিকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগও মামুনুর রশীদের বিরুদ্ধে উঠেছে। একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। যদিও উক্ত ভিডিওটির নির্ভরযোগ্য লিংক বা আনুষ্ঠানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তবুও ঘটনাটি স্থানীয় সাংবাদিক মহলে চরম অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে।

ইন্দুরকানীতে এর আগেও সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হুমকির ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের দ্বারা সাংবাদিক নির্যাতনের অভিযোগ ওঠায় এই অঞ্চলে সংবাদকর্মীদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।

বদলি হলেও হয়নি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা

এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে মামুনুর রশীদকে ইন্দুরকানী থেকে প্রথমে বরিশাল হয়ে পরবর্তীতে খুলনায় বদলি করা হয়। তবে তার বিরুদ্ধে কোনো বিভাগীয় মামলা, ফৌজদারি তদন্ত বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে। কেবল বদলির মধ্য দিয়েই বিষয়টি নিষ্পত্তি করা হয়েছে, যা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।

স্থানীয় সচেতন মহল ও জনপ্রতিনিধিরা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর মাধ্যমে একটি নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

প্রশাসনের বক্তব্য ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন

খাদ্য অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“এগুলো মূলত প্রশাসনিক অনিয়ম। এখন পর্যন্ত প্রমাণিত কোনো দুর্নীতির মামলা হয়নি।”

তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রশাসনিক অনিয়ম ও দায়িত্বহীনতার মধ্য দিয়েই অনেক সময় বড় ধরনের দুর্নীতির পথ তৈরি হয়। সরকারি খাদ্য সহায়তা কর্মসূচির মতো স্পর্শকাতর খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে কঠোর নজরদারি ও কার্যকর তদন্ত জরুরি বলে মত বিশ্লেষকদের।

এই ঘটনায় খাদ্য বিভাগের অভ্যন্তরীণ তদারকি ব্যবস্থার দুর্বলতা নতুন করে সামনে এসেছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *