উত্তরা বিআরটিএতে ঘুষের রমরমা বাণিজ্য: লাইসেন্স পেতে বাড়তি টাকা, অভিযোগ পরিচালক বশির উদ্দিনের বিরুদ্ধে

স্টাফ রিপোর্টার:

বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ)-তে ঘুষ ও দুর্নীতির অভিযোগ নতুন কিছু নয়। দীর্ঘদিন ধরেই ড্রাইভিং লাইসেন্স, গাড়ির ফিটনেস ও অন্যান্য সেবা নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে নানা ভোগান্তি ও অনিয়মের শিকার হতে হচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর উত্তরা এলাকায় অবস্থিত বিআরটিএ মেট্রো সার্কেল–৩ কার্যালয়ে ঘুষের হার বাড়ানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে।

সরেজমিনে উত্তরা ডিয়াবাড়ি এলাকার বিআরটিএ মেট্রো সার্কেল–৩ কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিদিন শত শত মানুষ ড্রাইভিং লাইসেন্স, নবায়ন ও বিভিন্ন সেবা নিতে সেখানে ভিড় করছেন। কিন্তু নিয়ম অনুযায়ী সেবা পাওয়া অনেকের কাছেই যেন স্বপ্নের মতো। অভিযোগ রয়েছে, দালাল ও কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে এখানে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী ঘুষ বাণিজ্যের সিন্ডিকেট।

সেবা নিতে আসা কয়েকজন ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষায় পাশ করানোর নামে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা নেওয়া হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ভুক্তভোগী জানান, কয়েক মাস আগেও ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষায় পাশ করাতে দালালদের মাধ্যমে প্রায় ২ হাজার ৫০০ টাকা দিতে হতো। কিন্তু বর্তমানে সেই টাকা বাড়িয়ে ৩ হাজার ৫০০ টাকা করা হয়েছে। একইভাবে পেশাদার লাইসেন্স নবায়ন পরীক্ষায় আগে ১ হাজার ৫০০ টাকা নিলেও এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ হাজার ৫০০ টাকায়।

ভুক্তভোগীদের দাবি, এসব ঘুষের টাকা না দিলে নানা অজুহাতে তাদের পরীক্ষায় ফেল করানো হয় কিংবা ফাইল দীর্ঘদিন আটকে রাখা হয়। ফলে বাধ্য হয়ে অনেকেই দালালদের শরণাপন্ন হন।

তদন্তের সময় বিআরটিএ কার্যালয়ের ভেতরে অবস্থানরত কয়েকজন দালালের সঙ্গেও কথা হয় প্রতিবেদকের। তারা প্রকাশ্যেই বিভিন্ন সেবা দ্রুত করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে টাকা দাবি করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনই একজন ভুক্তভোগী পেশাদার চালক জানান, প্রায় আট মাস আগে তিনি লাইসেন্স নবায়নের জন্য বিআরটিএ কার্যালয়ে আসেন। এ সময় ২০৯ নম্বর রুমের সামনে টিটু নামের এক ব্যক্তি নিজেকে ওই রুমের কর্মকর্তা মামুনের ঘনিষ্ঠ পরিচয় দিয়ে তার কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা নেন।

ভুক্তভোগী জানান, টিটু তাকে আশ্বাস দিয়েছিলেন যে নির্ধারিত টাকার বিনিময়ে পরীক্ষায় পাশ করিয়ে লাইসেন্স নবায়নের সব কাজ দ্রুত শেষ করে দেবেন। কিন্তু আট মাস পার হলেও এখনো তার কাজের কোনো অগ্রগতি হয়নি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওই দালাল টিটু এখন তাকে উল্টো হুমকি দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, কীভাবে দীর্ঘদিন ধরে বিআরটিএ কার্যালয়ের ভেতরেই প্রকাশ্যে দালালদের এমন কর্মকাণ্ড চলতে পারে। সাধারণ মানুষের অভিযোগ, কার্যালয়ের বিভিন্ন রুমের সামনে দাঁড়িয়ে দালালরা অবাধে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে, অথচ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যেন সবকিছু দেখেও না দেখার ভান করছে।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধেও ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, দালালদের মাধ্যমে আদায় করা এই টাকার একটি অংশ দিন শেষে লাইসেন্স পরীক্ষা বোর্ডের দায়িত্বে থাকা পরিদর্শকদের কাছে পৌঁছে যায়। পরে তা ধাপে ধাপে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছেও যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে উত্তরা বিআরটিএ মেট্রো সার্কেল–৩ কার্যালয়ের পরিচালক বশির উদ্দিনের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করা হয়। তিনি এসব অভিযোগের বিষয়ে স্পষ্ট কোনো জবাব দিতে পারেননি। বরং তিনি বিষয়টি অন্যান্য কর্মকর্তাদের ওপর চাপিয়ে নিজেকে দায়মুক্ত করার চেষ্টা করেছেন বলে প্রতিবেদকের কাছে মনে হয়েছে।

সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, যদি এসব অনিয়ম ও ঘুষ বাণিজ্য প্রকাশ্যেই চলে, তাহলে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কেন কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছেন না। দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের অভিযোগ ওঠার পরও কেন পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না—এ নিয়েও নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

ভুক্তভোগীরা বলছেন, বিআরটিএতে সেবা নিতে এসে যেন সাধারণ মানুষকে এক ধরনের অঘোষিত দালাল নির্ভর ব্যবস্থার মধ্যে পড়তে হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন সেবা গ্রহীতারা, অন্যদিকে সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

উত্তরা বিআরটিএ কার্যালয়ে ঘুষ ও দালালচক্রের এই অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে—এমনটাই প্রত্যাশা করছেন ভুক্তভোগীরা।

এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য ও নতুন অভিযোগ নিয়ে ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পরবর্তী পর্ব প্রকাশিত হবে শিগগিরই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *