স্টাফ রিপোর্টার:
রাজধানীর শ্যামপুরে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি ও ওএমএস বিক্রয়ে ভয়াবহ দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে তদারককারী কর্মকর্তা এস এম হামিদের বিরুদ্ধে। প্রতি ডিলারের কাছ থেকে নিয়মিত ঘুষ নেওয়া, দায়িত্ব পালন না করে ফোনে ফোনে নির্দেশ দেওয়া এবং বিক্রির খাতায় জালিয়াতি করার অভিযোগে ক্ষুব্ধ স্থানীয় জনগণ মঙ্গলবার একটি ট্রাক আটক করে পুলিশে সোপর্দ করে। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসতেই এলাকাজুড়ে ব্যাপক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় প্রতিটি ডিলারের কাছ থেকে এস এম হামিদ নিয়মিতভাবে ট্রাক সেল থেকে ২,০০০ টাকা এবং দোকান সেল থেকে আরও ২,০০০ টাকা ঘুষ নেন। ঘুষ দিলে তিনি আর নিয়মিত দায়িত্ব পালন করেন না, বরং ফোনেই বিক্রির নির্দেশনা দেন। অভিযোগ রয়েছে, বিক্রি শেষ হওয়ার পর ট্রাকের সামনে উপস্থিত থেকে কতটুকু চাল ও আটা অবিক্রিত রয়েছে তা খাতায় লিপিবদ্ধ করার নিয়ম থাকলেও তিনি তা মানেন না।
গত মঙ্গলবার ডিলার মো. ইমরান হোসেনের ট্রাকে চাল-আটা বিক্রি হচ্ছিল। নিয়ম অনুযায়ী এস এম হামিদকে শুরু থেকে উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও তিনি দুপুর তিনটার দিকে এসে ডিলারের কাছ থেকে ২,০০০ টাকা ঘুষ নিয়ে দ্রুত সরে পড়েন। এরপর আর ট্রাকের সামনে আসেননি। ফলে বিক্রি শেষে অবিক্রিত মাল গণনার কাজও তিনি করেননি।
বিকেল পাঁচটার দিকে ডিলার ট্রাকভর্তি চাল ও আটা নিয়ে স্থান ত্যাগ করতে গেলে এলাকাবাসী তাকে আটকে প্রশ্ন করেন, “আজ অবিক্রিত কত মাল রইল?”—এ প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে স্থানীয়রা শ্যামপুর থানা পুলিশকে খবর দিলে পুলিশ এসে ট্রাকটি জব্দ করে।
নিয়ম অনুযায়ী, বিক্রি শেষে তদারককারী কর্মকর্তা খাতায় লিখে দেন—কত বস্তা চাল এবং কত বস্তা আটা অবিক্রিত রয়েছে। কিন্তু ওইদিন এস এম হামিদ ঘুষ নিয়ে চলে যাওয়ায় পুরনো খাতায় সব বিক্রি হয়ে গেছে বলে ভুয়া তথ্য লিখে যান। কিন্তু ট্রাকে তখনও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ চাল-আটা পাওয়া যায়। ডিলার পুরনো খাতা দেখাতে ব্যর্থ হলে সন্দেহ আরও বাড়ে।
সাংবাদিকরা বিষয়টি জানতে পেরে ঘটনাস্থলে ছুটে যান এবং ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেন এস এম হামিদের সঙ্গে। তবে তিনি কোনো ফোনই রিসিভ করেননি। এমনকি ওএমএস–এর আরেক কর্মকর্তাকেও জানানো হলেও তিনিও ফোন ধরেননি।
এ বিষয়ে ট্রাক সেলের ড্রাইভার বলেন, বিকেল ৩:০০টার দিকে তদারককারী কর্মকর্তা এস এম হামিদ একবার এসেছিলেন; তারপর আর আসেননি।
পরে রাত আটটার দিকে ডিলার পুলিশকে একটি নতুন খাতা দেখান, যেখানে এস এম হামিদের নতুন হস্তাক্ষরে লেখা রয়েছে—১৮ বস্তা চাল ও ২১ বস্তা আটা অবিক্রিত। অভিযোগ উঠেছে, ডিলারকে রক্ষায় এবং পুরনো জালিয়াতির খাতা আড়াল করতে তড়িঘড়ি করে এই নতুন এন্ট্রি তৈরি করা হয়। পুলিশ নতুন খাতার ভিত্তিতে ট্রাক ফেরত দিলেও স্থানীয়দের ক্ষোভ আরও তীব্র হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক খাদ্য অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা বলেন,
“এস এম হামিদ ও তার ঘনিষ্ঠজনেরা দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়েছে। তাদের কারণে ওএমএস কর্মসূচির সুনাম নষ্ট হচ্ছে।”
সরকারের গরিব জনগণের জন্য চাল ও আটা সহায়তা কার্যক্রম যেখানে স্বচ্ছতার প্রতিশ্রুতিতে পরিচালিত হওয়ার কথা, সেখানে তদারককারী কর্মকর্তার ঘুষ–বাণিজ্য ও জালিয়াতি প্রশাসনিক ব্যর্থতার চিত্র আরও স্পষ্ট করল। স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত এস এম হামিদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।