মোঃ আনজার শাহ:
বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্বিন্যাসের আলোচনায় আবারও উঠে এসেছে কুমিল্লাকে পূর্ণাঙ্গ বিভাগ হিসেবে ঘোষণার দাবি। ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভৌগোলিক অবস্থান, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার বিচারে কুমিল্লা যে দীর্ঘদিন ধরেই বিভাগীয় মর্যাদার দাবিদার—তা নতুন করে জোরালোভাবে তুলে ধরছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, এটি কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং একটি অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের ন্যায্য প্রত্যাশার প্রতিফলন।
গোমতী নদীর তীরে অবস্থিত কুমিল্লা বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহাসিক নগরী। প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন, প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই জনপদ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। পরিকল্পিত নগর কাঠামো, বিস্তৃত জনসংখ্যা ও প্রশাসনিক সক্ষমতা—সব মিলিয়ে কুমিল্লা একটি পূর্ণাঙ্গ বিভাগ হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ভিত্তি ইতোমধ্যেই তৈরি করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে মহান মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে কুমিল্লার ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে এই অঞ্চলটি ২ নম্বর সেক্টরের অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর খালেদ মোশাররফ-এর নেতৃত্বে পরিচালিত হয়। অসংখ্য শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধার আত্মত্যাগ এই অঞ্চলকে দিয়েছে বিশেষ মর্যাদা, যা কুমিল্লার ঐতিহাসিক গুরুত্বকে আরও দৃঢ় করেছে।
সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের দিক থেকেও কুমিল্লা একটি সমৃদ্ধ ভাণ্ডার। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় কাটিয়েছেন এখানে; এই শহরেই তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর পদচারণায়ও ধন্য কুমিল্লা। উপমহাদেশের সংগীত জগতের দুই উজ্জ্বল নক্ষত্র শচীন দেব বর্মণ এবং রাহুল দেব বর্মণ-এর জন্মভূমি এই জনপদ, যা এর সাংস্কৃতিক শক্তিমত্তার উজ্জ্বল প্রমাণ।
শিক্ষা ও প্রশাসনিক অবকাঠামোর ক্ষেত্রেও কুমিল্লা শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ, কুমিল্লা ক্যাডেট কলেজ ও কুমিল্লা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটসহ অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এ অঞ্চলে গড়ে উঠেছে। একসময় কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ড-এর অধীনে বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে, যা কুমিল্লার প্রশাসনিক সক্ষমতার একটি সুস্পষ্ট উদাহরণ।
সামরিক দিক থেকেও কুমিল্লার গুরুত্ব অপরিসীম। ময়নামতি ক্যান্টনমেন্ট দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি হিসেবে স্বীকৃত, যা জাতীয় নিরাপত্তা ও কৌশলগত অবস্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
যোগাযোগ ব্যবস্থায় কুমিল্লা দেশের পূর্বাঞ্চলের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। ঐতিহাসিক গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড এই অঞ্চলের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করেছে, যা প্রাচীনকাল থেকেই বাণিজ্য ও যাতায়াতের অন্যতম প্রধান পথ। বর্তমানেও সড়ক যোগাযোগ, সীমান্ত বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক সংযোগের ক্ষেত্রে কুমিল্লার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থনৈতিক সম্ভাবনার ক্ষেত্রেও কুমিল্লা এগিয়ে। খাদি কাপড়, বাটিক শিল্প ও ঐতিহ্যবাহী মিষ্টান্ন—বিশেষ করে রসমালাই—দেশজুড়ে কুমিল্লাকে একটি স্বতন্ত্র পরিচিতি দিয়েছে। কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং সীমান্তবর্তী অবস্থানের কারণে বাণিজ্যিক সম্ভাবনাও এখানে ব্যাপক।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, কুমিল্লার ১৬টি উপজেলার বিস্তৃত ভৌগোলিক এলাকা ও বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জন্য পৃথক বিভাগ গঠন এখন সময়ের দাবি। এতে প্রশাসনিক সেবা আরও দ্রুত ও কার্যকরভাবে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে এবং কেন্দ্রীয় চাপও কিছুটা কমবে।
সচেতন নাগরিকদের মতে, কুমিল্লাকে বিভাগ হিসেবে ঘোষণা করা হলে এটি কেবল একটি প্রশাসনিক স্বীকৃতি হবে না; বরং এই অঞ্চলের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও অবদানের যথাযথ মূল্যায়ন হবে। তাই দ্রুত সময়ের মধ্যেই এ বিষয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়ার দাবি জানানো হচ্ছে।
সবশেষে বলা যায়, কুমিল্লা আজ কেবল একটি জেলা নয়; এটি ইতিহাস, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও সম্ভাবনার এক অনন্য সমন্বয়। সেই বাস্তবতায় কুমিল্লাকে বিভাগ হিসেবে ঘোষণা করা এখন আর বিলম্ব করার মতো বিষয় নয়—এমনটাই মনে করছেন।