স্টাফ রিপোর্টার:
খুলনা অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ মৎস্যঘাট ও নদীসংলগ্ন প্রশাসনিক স্টেশনের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা মোঃ নাসির উদ্দীনের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার করে স্থানীয় জেলেদের কাছ থেকে নিয়মিত অবৈধভাবে অর্থ আদায়ের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় জেলে সম্প্রদায়ের একাধিক সদস্যের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে নানা অজুহাতে তাদের কাছ থেকে টাকা আদায় করা হচ্ছে এবং টাকা না দিলে মাছ ধরার অনুমতি, নৌকা চলাচল কিংবা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক সুবিধা পেতে বিভিন্ন ধরনের হয়রানির মুখে পড়তে হয়। ফলে দরিদ্র জেলেদের জীবিকা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় জেলেরা জানান, নদীতে মাছ ধরেই তাদের সংসার চলে। কিন্তু মাছ ধরতে যাওয়ার আগেই যদি বিভিন্ন অজুহাতে টাকা দিতে বাধ্য করা হয়, তাহলে তাদের পক্ষে পরিবার চালানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। অনেকেই নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, স্টেশন কর্মকর্তা নাসির উদ্দীন নিয়মিতভাবে জেলেদের কাছ থেকে অর্থ দাবি করেন এবং টাকা না দিলে নানা ধরনের প্রশাসনিক জটিলতা সৃষ্টি করা হয়। একজন জেলে বলেন, “আমরা গরিব মানুষ। নদীতে মাছ ধরে কোনোভাবে সংসার চালাই। কিন্তু মাছ ধরতে যাওয়ার আগে যদি টাকা দিতে হয়, তাহলে আমাদের অবস্থা কী হবে? অনেক সময় বাধ্য হয়েই টাকা দিতে হয়।”
আরেকজন জেলে অভিযোগ করে বলেন, “টাকা না দিলে আমাদের নৌকা আটকে দেওয়া হয়। কাগজপত্র নিয়ে নানা ধরনের ঝামেলা করা হয়। অনেক সময় নদীতে নামতেও বাধা দেওয়া হয়। তাই বাধ্য হয়ে অনেকেই টাকা দিয়ে দেন।” জেলেদের অভিযোগ অনুযায়ী, কখনো প্রতিদিন আবার কখনো সাপ্তাহিক ভিত্তিতে নির্দিষ্ট অংকের টাকা দিতে হয়। মাঝেমধ্যে বড় অংকের টাকাও দাবি করা হয় বলে জানিয়েছেন কয়েকজন জেলে।
শুধু জেলেরা নয়, স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই বলছেন এই অভিযোগ নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই এ ধরনের অভিযোগ স্থানীয়ভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে, কিন্তু ভয়ের কারণে কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না। স্থানীয় এক ব্যবসায়ী বলেন, “এই ধরনের অভিযোগ আমরা বহুদিন ধরে শুনে আসছি। কিন্তু কেউ প্রকাশ্যে বলতে চায় না, কারণ পরে হয়রানির আশঙ্কা থাকে।” আরেকজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “জেলেরা অত্যন্ত দরিদ্র মানুষ। তাদের কাছ থেকে যদি এভাবে টাকা নেওয়া হয়, তাহলে তাদের জীবন আরও কষ্টকর হয়ে যায়।”
স্থানীয় একটি সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধি বলেন, “দুর্নীতি যদি এভাবে চলতে থাকে তাহলে সাধারণ মানুষের মধ্যে সরকারের প্রতি আস্থা কমে যাবে। প্রশাসনের দায়িত্ব হলো সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানো, তাদের কাছ থেকে অবৈধভাবে টাকা আদায় করা নয়।” তিনি আরও বলেন, অভিযোগের বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
দৈনিক স্বাধীন সংবাদের অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিষয়টি ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নজরে এসেছে। প্রাথমিকভাবে অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখার জন্য একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে। তবে তদন্তের অগ্রগতি বা সম্ভাব্য সময়সীমা সম্পর্কে এখনো বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, “অভিযোগটি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। যদি তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এদিকে অভিযুক্ত স্টেশন কর্মকর্তা মোঃ নাসির উদ্দীনের বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কাছ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কল রিসিভ করেননি। এছাড়া অফিসে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি বলে জানা গেছে। তবে প্রশাসনের কিছু সূত্র বলছে, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগগুলো সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশের উপকূলীয় ও নদীসংলগ্ন অঞ্চলের জেলে সম্প্রদায় দীর্ঘদিন ধরেই নানা সমস্যার মধ্যে দিয়ে জীবনযাপন করছে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, নদীতে মাছের পরিমাণ কমে যাওয়া, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতার কারণে তাদের জীবিকা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। এই পরিস্থিতিতে যদি তাদের অতিরিক্ত অবৈধ অর্থ দিতে বাধ্য করা হয়, তাহলে তা তাদের জন্য বড় ধরনের সংকট তৈরি করে।
একজন প্রবীণ জেলে বলেন, “আগে মাছ ধরলে ভালো আয় হতো। এখন নদীতে মাছ কমে গেছে। খরচও বেড়ে গেছে। তার ওপর যদি টাকা দিতে হয় তাহলে আমরা বাঁচবো কীভাবে?” তিনি আরও বলেন, জেলেরা চান যেন তাদের ওপর কোনো ধরনের অন্যায় চাপ সৃষ্টি না করা হয় এবং তারা স্বাভাবিকভাবে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতে পারেন।
সুশাসন ও দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা মনে করছেন, এ ধরনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। এক দুর্নীতি বিরোধী কর্মী বলেন, “সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছে। তাই কোনো কর্মকর্তা যদি ক্ষমতার অপব্যবহার করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অবৈধভাবে অর্থ আদায় করেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে দ্রুত ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো সরকারি কর্মকর্তা যদি ক্ষমতার অপব্যবহার করে অবৈধভাবে অর্থ আদায় করেন, তাহলে তা ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। এ ধরনের ক্ষেত্রে বিভাগীয় তদন্ত, সাময়িক বরখাস্ত, প্রশাসনিক শাস্তি কিংবা ফৌজদারি মামলাও হতে পারে। তাই অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে তারা মনে করেন।
এদিকে স্থানীয় জেলে সম্প্রদায় ও সচেতন নাগরিকরা এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা, ক্ষতিগ্রস্ত জেলেদের বক্তব্য গ্রহণ করা, অবৈধ অর্থ আদায়ের প্রমাণ সংগ্রহ করা এবং তদন্তের ফলাফল প্রকাশ করা—এসব পদক্ষেপ নেওয়া হলে প্রকৃত সত্য সামনে আসবে।
ক্ষতিগ্রস্ত জেলেদের প্রত্যাশা, প্রশাসন দ্রুত তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করবে এবং যদি কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এক জেলের ভাষায়, “আমরা কোনো ঝামেলা চাই না। শুধু চাই আমাদের যেন আর টাকা দিতে না হয় এবং আমরা শান্তিতে মাছ ধরে সংসার চালাতে পারি।”
স্টেশন কর্মকর্তা মোঃ নাসির উদ্দীনের বিরুদ্ধে ওঠা এই অভিযোগ এখন স্থানীয়ভাবে আলোচিত একটি বিষয়ে পরিণত হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য প্রশাসনের নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তাদের মতে, তদন্তের মাধ্যমে যদি অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। অন্যদিকে যদি অভিযোগ ভিত্তিহীন হয়, তাহলে সেটিও পরিষ্কারভাবে জানানো প্রয়োজন। কারণ সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং সাধারণ মানুষের আস্থা বজায় রাখতে স্বচ্ছ তদন্ত ও জবাবদিহিতা অপরিহার্য।