মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেন:
খুলনা আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় (Regional Food Controller’s Office, Khulna) – যার গেটের সামনে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের লোগো এবং ফুলের গাছ সাজানো – এখন দুর্নীতি ও অনিয়মের একটি প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। সরকারি খাদ্য বিতরণ, ওএমএস (ওপেন মার্কেট সেল), ধান-চাল সংগ্রহ, ডিলার নিয়োগ, গুদাম তদারকি – সবকিছুতেই ঘুষ, কমিশন, বদলি বাণিজ্য ও সিন্ডিকেটের অভিযোগ উঠেছে। জুলাই ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পরও এই অফিসে দুর্নীতির চক্র ভাঙেনি, বরং নতুন করে ফুঁসে উঠেছে। দুদকের অভিযোগ, মিডিয়া রিপোর্ট, স্থানীয় ডিলার ও কৃষকদের লিখিত অভিযোগ এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও-ছবি থেকে এই চিত্র স্পষ্ট।
দুর্নীতির প্রধান অভিযোগসমূহ: এক নজরে
খুলনা আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে দুর্নীতির অভিযোগগুলো নিম্নরূপ:
ঘুষ ও বদলি বাণিজ্য: আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক (আরসিফুড) ও জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (ডিসিফুড) পদে বদলির জন্য কোটি কোটি টাকার লেনদেনের অভিযোগ। ২০২৫ সালে একাধিক কর্মকর্তা (ইকবাল বাহার চৌধুরী, কাজী সাইফুদ্দীন, মোহাম্মদ মামুনুর রশিদ প্রমুখ) বদলির পরও অভিযোগ অব্যাহত। একটি সূত্র অনুসারে, বদলির জন্য ৩–৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দাবি করা হয়েছে।
ওএমএসে অনিয়ম: ওপেন মার্কেট সেলে চাল-আটা বিক্রিতে কালোবাজারি, কম ওজন, নিম্নমানের পণ্য সরবরাহ। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মনিটরিংয়ে ২০২৫–২০২৬ সালে একাধিক পয়েন্টে দুর্নীতির প্রমাণ মিলেছে। ডিলারদের কাছ থেকে ঘুষ না দিলে বরাদ্দ কমানো বা বাতিলের হুমকি দেওয়া হয়েছে।
ধান-চাল সংগ্রহে কেজিপ্রতি ঘুষ: আমন ধান-চাল সংগ্রহ অভিযানে প্রতি কেজিতে ১০ পয়সা থেকে ১ টাকা ঘুষ আদায়। মিল মালিক, গুদাম কর্মকর্তা ও কৃষকদের জিম্মি করে অতিরিক্ত বরাদ্দ, ভুয়া কৃষকের নামে বিল উত্তোলন। গুদামের ধারণক্ষমতার কয়েকগুণ ধান-চাল কেনা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রশ্নপত্র ফাঁস ও নিয়োগ দুর্নীতি: খুলনা জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের বিরুদ্ধে তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস করে ৫ কোটি টাকায় বিক্রির অভিযোগ। আদালতের আদেশ উপেক্ষা, ওএমএস ডিলার নিয়োগে স্বজনপ্রীতি চালু আছে।
গুদাম ও সরবরাহে অনিয়ম: পুরনো বস্তায় নতুন বস্তার নামে সরবরাহ, পচা-পুরনো ধান-চাল বিতরণ। তেরখাদা, রূপসাসহ বিভিন্ন উপজেলায় এমন ঘটনা ঘটেছে।
দুদক অভিযোগ ও তদন্ত: একাধিক ডিলার (ইমন শেখ প্রমুখ) দুদকে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। কিন্তু তদন্তে অভিযোগকারীকে না ডেকে প্রহসনের অভিযোগ উঠেছে।
সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ (২০২৫–২০২৬)
-
আগস্ট ২০২৫: আরসিফুড ইকবাল বাহার চৌধুরী ও ডিসিফুড কাজী সাইফুদ্দীনকে বদলি। দুদকে ৩ লাখ টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগ।
-
অক্টোবর ২০২৫: জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক তানভীর হোসেনের বিরুদ্ধে প্রশ্নপত্র ফাঁস, ১০ কোটি টাকা ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ।
-
জানুয়ারি ২০২৬: ওএমএসে দুর্নীতি, বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থীদের অভিযানে প্রমাণ মিলেছে।
-
ফেব্রুয়ারি ২০২৬: ধান সংগ্রহে কেজিপ্রতি ঘুষ, পুরনো বস্তা সরবরাহের অভিযোগ।
জনগণের ওপর প্রভাব
খাদ্য নিরাপত্তা কর্মসূচি দুর্বল হয়ে পড়েছে। নিম্ন আয়ের মানুষ ওএমএস পয়েন্টে লাইনে দাঁড়িয়ে খালি হাতে ফিরছে। কৃষকরা সংগ্রহ মূল্য না পেয়ে হতাশ। সরকারি তহবিলের অপচয়ে জাতীয় অর্থনীতিতে চাপ পড়ছে।
সরকারি প্রতিক্রিয়া ও সংস্কারের দাবি
নতুন সরকার দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভাষণে বলেছেন, “দুর্নীতি করে কেউ পার পাবে না।” কিন্তু খুলনায় এখনও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। স্থানীয়রা দাবি করছেন:
-
দুদকের নিরপেক্ষ তদন্ত
-
দোষীদের বিরুদ্ধে শাস্তি
-
ডিজিটাল মনিটরিং সিস্টেম চালু
-
ডিলার-কৃষকদের অংশগ্রহণে কমিটি গঠন
উপসংহার
খুলনা আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের ছবি – যেখানে সরকারি লোগোর নিচে দুর্নীতির ছায়া – বাংলাদেশের খাদ্য ব্যবস্থার দুর্বলতার প্রতীক। দুর্নীতিমুক্ত খাদ্য বিতরণ না হলে জনগণের খাদ্য অধিকার ক্ষুণ্ণ হবে। দৈনিক স্বাধীন সংবাদ এই লড়াইয়ে সোচ্চার থাকবে।