গৌরীপুরে রহস্যজনক মৃত্যু: আদালতের নির্দেশে কবর থেকে উত্তোলন করা হলো আব্দুল্লাহর লাশ

মোশারফ হোসেন জসিম পাঠান:

ময়মনসিংহ জেলার গৌরীপুর উপজেলার কামারজানি গ্রামের এক তরুণের রহস্যজনক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে এলাকায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। মৃত যুবকের নাম মোঃ সুমন (ডাকনাম আব্দুল্লাহ), বয়স ৩০ বছর। তিনি ওই গ্রামের হাবিবুর রহমানের ছেলে। প্রায় দুই বছর আগে ঘটে যাওয়া রহস্যজনক এই মৃত্যুর ঘটনাকে ঘিরে সম্প্রতি আদালতের নির্দেশে পুনরায় উত্তোলন করা হয়েছে তার লাশ।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালের ৩০ জুন বিকেল ৪টার দিকে কামারজানি গ্রামের একটি খালের পাশে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায় আব্দুল্লাহকে। স্থানীয়রা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে গৌরীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। পরে পারিবারিকভাবে দাফন সম্পন্ন করা হয়। শুরুতে সবাই ধারণা করেছিলেন, বজ্রপাতে মারা গেছেন তিনি। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে তার মৃত্যু নিয়ে দেখা দেয় নানা প্রশ্ন।

পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল হাবিবুর রহমানের দুই স্ত্রীর মধ্যে। সেই বিরোধের জের ধরেই আবারও আলোচনায় আসে আব্দুল্লাহর মৃত্যু। ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি হাবিবুর রহমানের স্ত্রী মোছাঃ মজিদা আক্তার (৫৭) ময়মনসিংহের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-৪ এ একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় গৌরীপুর উপজেলার মোঃ হাসান মিয়া (২৪)সহ ১০ জনকে আসামি করা হয় এবং অজ্ঞাত ৫-৬ জনের বিরুদ্ধেও অভিযোগ আনা হয়। মামলাটি নথিভুক্ত হয় সি.আর. নং ৪৯/২৫ হিসেবে।

বিচারক মামলাটি আমলে নিয়ে তদন্তের নির্দেশ দেন। তদন্তের অংশ হিসেবে গৌরীপুর থানায় মামলা নথিভুক্ত হয় ৭ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে, ধারা ৩০২/১০৯/৩৪ দণ্ডবিধি ১৮৬০ অনুযায়ী। আদালতের নির্দেশে একই দিনে কবর থেকে উত্তোলন করা হয় মৃত আব্দুল্লাহর লাশ এবং তা ময়নাতদন্তের জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।

লাশ উত্তোলনের খবর ছড়িয়ে পড়তেই এলাকায় সৃষ্টি হয় ব্যাপক আলোড়ন। অনেকে মনে করেন, মৃত্যুর পেছনে রয়েছে রহস্য। আবার কেউ কেউ দাবি করেন, সেদিন প্রচণ্ড বৃষ্টি ও বজ্রপাতের কারণে বজ্রাঘাতে প্রাণ হারিয়েছিলেন আব্দুল্লাহ। স্থানীয় এক প্রবীণ বাসিন্দা বলেন, “আমরা শুনেছি, সেদিন বজ্রপাত হয়েছিল। হয়তো সেই কারণেই মারা যায় সে। কিন্তু নতুন করে মামলা হওয়ায় সবাই অবাক।”

ঘটনার পর ঢাকা থেকে প্রকাশিত কয়েকটি জাতীয় দৈনিকের সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীরা সরেজমিনে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তারা স্থানীয়দের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করছেন এবং ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ের চেষ্টা করছেন। মানবাধিকার সংগঠনের এক প্রতিনিধি বলেন, “যদি এই মৃত্যুর পেছনে কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থাকে, তদন্তেই তা বের হয়ে আসবে। আদালতের নির্দেশে লাশ উত্তোলন ইতিবাচক পদক্ষেপ।”

পরিবার ও এলাকাবাসীর মধ্যে এখন আতঙ্ক বিরাজ করছে। হাবিবুর রহমানের দুই স্ত্রীর মধ্যে বিরোধ এতটাই তীব্র যে, এই মৃত্যুর ঘটনার সঙ্গে পারিবারিক জটিলতাও জড়িয়ে পড়েছে বলে অনেকে মনে করেন। দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা এখনো বিদ্যমান।

রহস্যজনক মৃত্যুর প্রায় দুই বছর পর আদালতের নির্দেশে লাশ উত্তোলনের ঘটনায় নতুন করে শুরু হয়েছে আলোচনার ঝড়। এখন সকলের দৃষ্টি ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের দিকে। সেই প্রতিবেদনে কী উঠে আসে, সেটিই নির্ধারণ করবে আব্দুল্লাহর মৃত্যু প্রকৃতপক্ষে বজ্রপাতে হয়েছিল নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে পরিকল্পিত হত্যার রহস্য। এলাকাবাসী বলছেন, “আমরা শুধু সত্য জানতে চাই, যাতে এক তরুণের মৃত্যু নিয়ে আর বিভ্রান্তি না থাকে।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *