সাংবাদিকতা কেবল একটি পেশা নয়—এটি জনস্বার্থ রক্ষার এক অবিচল অঙ্গীকার। সত্য অনুসন্ধান, তথ্য যাচাই এবং নিরপেক্ষ উপস্থাপন—এই তিনটি মূলনীতির ওপর ভিত্তি করেই গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা গড়ে ওঠে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একশ্রেণির উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গোষ্ঠী সাংবাদিকদের পেশাগত কার্যক্রমকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে তাঁদের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। বিশেষত কোনো রাজনৈতিক নেতা বা দলীয় ব্যক্তিত্বের সঙ্গে একই ফ্রেমে ছবি থাকলেই সংশ্লিষ্ট সাংবাদিককে নির্দিষ্ট দলের অনুসারী হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি কেবল ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়; বরং সাংবাদিকতার স্বাধীনতার ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টির সুচিন্তিত কৌশল। একটি ছবি বা মুহূর্তকে প্রসঙ্গ থেকে বিচ্ছিন্ন করে বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে। অথচ বাস্তবতা হলো, একজন সাংবাদিককে পেশাগত দায়িত্ব পালনের স্বার্থে সমাজের সব স্তরের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হয়। রাজনৈতিক নেতা, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি কিংবা সাধারণ মানুষ—সবাই সংবাদসূত্র। সংবাদ সম্মেলন, জনসভা বা সামাজিক কর্মসূচিতে উপস্থিত থাকা সাংবাদিকতার স্বাভাবিক অংশ; এটি কোনোভাবেই দলীয় সম্পৃক্ততার প্রমাণ নয়।
এই প্রেক্ষাপটে জাতীয় সাংবাদিক সংস্থার কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সহ-দপ্তর সচিব মোহাম্মদ আনজার শাহ দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, “প্রকৃত সাংবাদিক কোনো দলের ব্যক্তিগত সম্পদ নয়। সাংবাদিকের একমাত্র পরিচয় তাঁর পেশাগত দায়িত্ববোধ ও নিরপেক্ষতা। মাঠে কাজ করতে গেলে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে ছবি থাকা স্বাভাবিক। একটি ছবি দিয়ে কারও রাজনৈতিক পরিচয় নির্ধারণ করা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।”
তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, “এ ধরনের অপপ্রচার কেবল একজন সাংবাদিককে নয়, পুরো গণমাধ্যম কাঠামোকেই প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা। যারা সত্য প্রকাশে নির্ভীক, তাঁদের মনোবল ভাঙার উদ্দেশ্যে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। সাংবাদিকতার মূল শক্তি হলো জনআস্থা। সেই আস্থাকে ক্ষুণ্ণ করার যেকোনো প্রচেষ্টা গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য গভীর অশনিসংকেত।”
মাঠপর্যায়ের সংবাদকর্মীরাই এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। প্রতিদিন নানা প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে তাঁরা তথ্য সংগ্রহ করেন, যাচাই করেন এবং জনগণের সামনে উপস্থাপন করেন। অথচ একটি বিভ্রান্তিকর পোস্ট বা বিকৃত ক্যাপশন মুহূর্তেই তাঁদের দীর্ঘদিনের সুনামকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। এতে ব্যক্তিগত মানহানি যেমন ঘটে, তেমনি গণমাধ্যমের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাও নড়বড়ে হয়ে পড়ে।
সাংবাদিক মূল্যায়নের মানদণ্ড প্রসঙ্গে মোহাম্মদ আনজার শাহ বলেন, “কার সঙ্গে ছবি আছে, সেটি নয়—তিনি কী লিখেছেন, কতটা বস্তুনিষ্ঠ থেকেছেন, সেটিই বিচার্য। সাংবাদিকতা কোনো দল বা গোষ্ঠীর প্রচারণার যন্ত্র নয়; এটি জনগণের কণ্ঠস্বর ও সমাজের দর্পণ।”
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দায়িত্বশীল ব্যবহারের আহ্বান জানিয়ে সংশ্লিষ্টরা বলেন, যাচাই না করে কোনো তথ্য বা ছবি শেয়ার করা যেমন অনৈতিক, তেমনি উদ্দেশ্যমূলক অপপ্রচার ছড়ানোও আইন ও নীতির পরিপন্থী। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষার দায় কেবল সাংবাদিকদের নয়; পাঠক, দর্শক ও নাগরিক সমাজকেও সমানভাবে বহন করতে হবে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, প্রকৃত সাংবাদিকতার বিকাশ, নিরপেক্ষতার চর্চা এবং জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার মধ্য দিয়ে একটি সুস্থ, শক্তিশালী ও গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব। শেষ পর্যন্ত সত্যই টিকে থাকে—এই অবিচল বিশ্বাস থেকেই সাংবাদিকরা কাজ করে যান। তাই বিভ্রান্তি ও অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সম্মিলিত অবস্থান নেওয়াই এখন সময়ের সবচেয়ে জরুরি দাবি।