দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) জালে বাগেরহাটের খাদ্য নিয়ন্ত্রক: জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মামলায় অভিযুক্ত শেখ মনিরুল হাসান ও স্ত্রী শারমিন আক্তার—টাকার বিনিময়ে মামলা ধামাচাপার অভিযোগ

মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেন

দেশব্যাপী দুর্নীতির বিরুদ্ধে চলমান অভিযানের অংশ হিসেবে বাগেরহাট জেলার খাদ্য বিভাগের এক গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা দায়ের করেছিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তবে সম্প্রতি অভিযোগ উঠেছে—এই বহুল আলোচিত মামলাটি প্রভাবশালী মহলের আশ্রয় ও অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে কার্যত ধামাচাপা দেওয়ার অপচেষ্টা চলছে, যা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে দুদকের স্বচ্ছতা ও তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে।

দুদক সূত্রে জানা যায়, বাগেরহাট সদর উপজেলার খাদ্য নিয়ন্ত্রক শেখ মনিরুল হাসান (৫৫) এবং তার স্ত্রী শারমিন আক্তার (৪৯)-এর বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করা হয়। দুদকের খুলনা সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মাহমুদুল হাসান শুভ্র ২০২৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার এই মামলা দুটি দায়ের করেন। মামলায় মোট প্রায় ৬৩ লাখ ৮৮ হাজার ৪৬৯ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়।

অভিযোগের অঙ্ক ও সম্পদের চিত্র

দুদকের মামলার এজাহার অনুযায়ী—

  • শেখ মনিরুল হাসানের বিরুদ্ধে ১৯ লাখ ৭৬ হাজার ৬৩৭ টাকা

  • তার স্ত্রী শারমিন আক্তারের বিরুদ্ধে ৪৪ লাখ ১১ হাজার ৮৩২ টাকা

জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে।

দুদকের অনুসন্ধানে উঠে আসে, শারমিন আক্তারের নামে মোট ১ কোটি ১৮ লাখ ৬৮ হাজার টাকার সম্পদের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। এর মধ্যে বৈধ আয়ের উৎস, পারিবারিক ব্যয় ও অন্যান্য হিসাব বাদ দিলে উল্লেখযোগ্য একটি অংশকে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

কর্মকর্তার পদ ও সংবেদনশীল দায়িত্ব

শেখ মনিরুল হাসান বর্তমানে বাগেরহাট সদর উপজেলার খাদ্য নিয়ন্ত্রক হিসেবে কর্মরত। খাদ্য অধিদপ্তরের এই পদটি অত্যন্ত সংবেদনশীল হিসেবে বিবেচিত হয়। জেলা পর্যায়ে খাদ্যশস্যের বরাদ্দ, সংগ্রহ, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিতরণ—সবকিছুর সঙ্গে এই পদটি সরাসরি জড়িত।

এর আগে তিনি খুলনার মহেশ্বরপাশা সিএসডি (কেন্দ্রীয় খাদ্য সংরক্ষণাগার)-এ সহকারী ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অভিযোগ রয়েছে, কেন্দ্রীয় খাদ্য গুদামগুলোতে দীর্ঘদিন ধরেই ওজন কারচুপি, নিম্নমানের খাদ্যশস্য গ্রহণ, পরিবহন বিল জালিয়াতি ও ঠিকাদার সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিপুল অর্থ লেনদেন হয়—যার সুযোগ নিয়ে অসাধু কর্মকর্তারা অবৈধভাবে সম্পদ গড়ে তোলেন।

স্ত্রীর নামে সম্পদ—আইনের চোখে অপরাধ

দুদক সূত্র জানায়, শারমিন আক্তারের নিজস্ব কোনো সরকারি চাকরি বা স্বতন্ত্র ব্যবসায়িক আয়ের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবুও তার নামে বিপুল পরিমাণ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ থাকার বিষয়টি সন্দেহজনক হিসেবে বিবেচিত হয়।

দুদকের অভিযোগে বলা হয়েছে, শেখ মনিরুল হাসান তার সরকারি ক্ষমতা ও প্রভাব খাটিয়ে অবৈধ উপার্জন করেছেন এবং সেই অর্থ স্ত্রীর নামে স্থানান্তর করে সম্পদ হিসেবে প্রদর্শন করেছেন—যা দুর্নীতি দমন আইন, ২০০৪ অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

দীর্ঘ ছয় বছরের অনুসন্ধান

এই মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এর অনুসন্ধান প্রক্রিয়া। দুদক সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সাল থেকেই শেখ মনিরুল হাসান ও তার পরিবারের সম্পদ নিয়ে অনুসন্ধান শুরু হয়। দীর্ঘ ছয় বছরে—

  • সম্পদ বিবরণী যাচাই

  • ব্যাংক হিসাব বিশ্লেষণ

  • জমি ও ফ্ল্যাট সংক্রান্ত দলিল পরীক্ষা

  • সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ

সহ একাধিক ধাপ অতিক্রম করে অবশেষে মামলা দায়ের করা হয়।

কিন্তু হঠাৎ নীরবতা—টাকা দিয়ে মামলা ধামাচাপার অভিযোগ

মামলা দায়েরের পর দীর্ঘ সময় পার হলেও তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় সুশীল সমাজ, সাংবাদিক ও দুর্নীতিবিরোধী সংগঠনগুলোর অভিযোগ—অভিযুক্ত পক্ষ প্রভাবশালী মহলের মাধ্যমে অর্থের বিনিময়ে মামলাটি নিষ্ক্রিয় করে রাখার চেষ্টা করছে।

একাধিক সূত্র দাবি করেছে, তদন্ত কর্মকর্তার ওপর অঘোষিত চাপ রয়েছে এবং মামলার গতি ইচ্ছাকৃতভাবে শ্লথ করা হয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে দুদকের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সুশীল সমাজের আহ্বান

এই প্রেক্ষাপটে খুলনা ও বাগেরহাট অঞ্চলের সুশীল সমাজ, নাগরিক সংগঠন ও মানবাধিকারকর্মীরা মামলাটির সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, যদি প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও প্রভাব ও অর্থের কারণে মামলা মুখ থুবড়ে পড়ে, তাহলে তা শুধু দুদকের ভাবমূর্তিই ক্ষুণ্ন করবে না—বরং দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাও নষ্ট করবে।

আইনি পরিণতি ও জনস্বার্থ

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অভিযোগ প্রমাণিত হলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কারাদণ্ডের পাশাপাশি জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার বিধান রয়েছে। খাদ্য বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে দুর্নীতি প্রমাণিত হলে তা সাধারণ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনাকে সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধ করে।

এই মামলা তাই কেবল একজন কর্মকর্তা ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে নয়—বরং রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে থেকে দুর্নীতি করলে কী পরিণতি হতে পারে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাকেস।

জনস্বার্থে মামলার পরবর্তী অগ্রগতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়—দুর্নীতির অভিযোগ সত্যিই আইনের কাঠগড়ায় নিষ্পত্তি হবে, নাকি অর্থ ও প্রভাবের কাছে আবারও নতি স্বীকার করবে বিচারপ্রক্রিয়া।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *