মোহাম্মদ হোসেন হ্যাপী, ব্যুরো চিফ:
নারায়ণগঞ্জ জেলার গোয়েন্দা শাখা—ডিবি—নিয়মিত মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করে আসছে। তারই ধারাবাহিকতায় মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূলের লক্ষ্যে জেলায় সোমবার পৃথক দুটি গোয়েন্দা পুলিশের অভিযানে মোট ৪০০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেটসহ দুইজন মাদক কারবারিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে নিয়মিত মামলা রুজু করে বিজ্ঞ আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে।
ডিবি সূত্রে জানা যায়, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিবি) মোঃ সোহেল মিয়ার তত্ত্বাবধানে পরিচালিত অভিযানে প্রথম গ্রেফতারকৃত হন রফিক ওরফে সিএনজি রফিক (৫৪)। অপর গ্রেফতারকৃত মোঃ সাইফুল (৪৫) কে আটক করা হয় রাতের অভিযানে। গোয়েন্দা পুলিশের দাবি—এরা দীর্ঘদিন ধরে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্যের কারবার চালিয়ে আসছিল।
২৪ অক্টোবর ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ, বিকেল আনুমানিক ৫টা ৪৫ মিনিটে ডিবির সাব-ইন্সপেক্টর (নিঃ) সজীব সাহা অভিজিৎ এর নেতৃত্বে সঙ্গীয় ফোর্সসহ নারায়ণগঞ্জ জেলার বন্দর থানাধীন চিড়াইপাড়া এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা হয়। লাঙ্গলবন্দ বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন আল মদিনা বাংলা খাবার হোটেলের সামনে পাকা রাস্তার ওপর সন্দেহভাজন আসামিকে আটকের উদ্দেশ্যে ডিবি পুলিশ অবস্থান নেয়।
এসময় পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পালানোর চেষ্টা করলে রফিক ওরফে সিএনজি রফিককে (৫৪) আটক করে তল্লাশি করা হয়। তার হাতে থাকা প্লাস্টিকের প্যাকেট থেকে ২০০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়। এ সময় তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনসহ অন্যান্য আলামতও জব্দ করা হয়।
গ্রেফতার রফিকের পিতার নাম মৃত হোসেন আলী এবং তার ঠিকানা—চিড়াইপাড়া, লাঙ্গলবন্দ বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন, থানা-বন্দর, জেলা-নারায়ণগঞ্জ। পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, তিনি দীর্ঘদিন ধরে সিএনজি চালিত অটোরিকশাকে আড়াল হিসেবে ব্যবহার করে ইয়াবা সরবরাহ করতেন। স্থানীয় কিছু দুষ্কৃতিকারী ও মাদক সিন্ডিকেটের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে বলে জানায় গোয়েন্দা পুলিশ।
একইদিন রাত আনুমানিক ২১:১০ ঘটিকায় সাব-ইন্সপেক্টর (নিঃ) বিরাজ দাসের নেতৃত্বে দ্বিতীয় অভিযান পরিচালিত হয় সিদ্ধিরগঞ্জের মৌচাক মিজমিজি এলাকায়। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ডিবি জানতে পারে, ফয়সাল টাওয়ার নামের একটি চারতলা ভবনের ২য় তলায় মাদক লেনদেন হচ্ছে। ভবনটির মালিক হাজী মোঃ গিয়াসউদ্দিন খাঁন—যিনি পিঃ ১৮৬-২, ব্লক-সি ঠিকানায় প্রতিষ্ঠিত ওই টাওয়ারের মালিক হিসেবে পরিচিত।
ডিবি দল দ্রুত অভিযান চালিয়ে ফ্ল্যাট থেকে মোঃ সাইফুল (৪৫) কে আটক করে। তল্লাশি করে তার নিকট থেকে ২০০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট জব্দ করা হয়। সাইফুলের পিতার নাম মিরাজ মিয়া এবং মাতার নাম গোলেছা বেগম। তিনি নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁ থানাধীন নয়াপাড়া এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা।
তিনি নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করে ইয়াবা ব্যবসা পরিচালনা করতেন বলে ডিবির দাবি। তিনি একটি বড় মাদক চক্রের সদস্য—যারা কক্সবাজারসহ দেশের সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে ইয়াবা সংগ্রহ করে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন অঞ্চলসহ রাজধানীর পাশ্ববর্তী এলাকাগুলোতে সরবরাহ করতো।
ডিবির একটি সূত্র জানায়—মাদক ব্যবসায় জড়িত কেউই ছাড় পাবে না। অপরাধী যত শক্তিশালীই হোক, পুলিশ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এই দুই অভিযানে গ্রেফতারকৃতদের ব্যাপারে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিবি) মোঃ সোহেল মিয়া বলেন—
“মাদক সমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আমরা জনগণের পাশে আছি। নারায়ণগঞ্জে মাদক নির্মূলে পুলিশ সবসময় সর্বোচ্চ তৎপরতা নিয়ে কাজ করছে। নিয়মিত অভিযানের কারণেই মাদক কারবারিরা এখন সংকুচিত। জনসাধারণের সহায়তা পেলে এই অভিযানের কার্যকারিতা আরও বৃদ্ধি পাবে।”
তিনি আরও বলেন—মাদকের উৎস খুঁজে বের করতে ও বড় সিন্ডিকেট চক্রকে ধরতে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এবং পুলিশের পরিসংখ্যান বলছে—
-
মাদক ব্যবসায় জড়িত অনেকেই এখন আবাসিক বাড়ি, খাবার হোটেল, পরিবহন ব্যবস্থাকে ব্যবহার করছে
-
বেশিরভাগ ইয়াবা আসে সীমান্তবর্তী টেকনাফ-কক্সবাজার অঞ্চল থেকে
-
শহুরে যুব সমাজ, শ্রমজীবী মানুষ ও বেকার তরুণরা মাদকের প্রধান শিকার
নারায়ণগঞ্জ, ঢাকার পাশ্ববর্তী একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও বাণিজ্য এলাকা। এখানে ভাসমান শ্রমিক এবং নিম্নআয়ের মানুষের সংখ্যা বেশি হওয়ায় মাদক ব্যবসায়ীরা সহজেই বাজার তৈরি করে নিচ্ছে। এ কারণেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি এখানে সবচেয়ে কঠোর।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সচেতন নাগরিকদের মতে—
“পরিবার ধ্বংস করছে মাদক। প্রশাসন আরও কঠোর হলে এই নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়বে।”
ডিবি পুলিশ জানিয়েছে—
-
দুইজনের বিরুদ্ধেই মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে
-
গ্রেফতারকৃতদের অদ্য বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে
-
তাদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে ইয়াবার উৎস, সরবরাহকারী এবং নেটওয়ার্ক খুঁজে বের করা হবে
পুলিশের ধারণা—এদের পেছনে আরও বড় চক্র সক্রিয় আছে।
নারায়ণগঞ্জে মাদকবিরোধী অভিযান আরও জোরদার করা হবে বলে জানিয়েছে ডিবি। এ জেলার সাধারণ মানুষের দাবিও—শুধু খুচরা কারবারি নয়, মূল গডফাদারদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
চলমান অভিযানের কারণে:
✔ যুবকদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হচ্ছে
✔ মাদক ব্যবসায়ীরা আতঙ্কে রয়েছে
✔ অনেক পরিবার নতুন করে স্বপ্ন দেখছে—নেশামুক্ত সমাজের
এই সফল অভিযানের মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জ জেলায় ডিবি পুলিশের কঠোর ও নিরবচ্ছিন্ন মাদকবিরোধী অবস্থান আবারও দৃশ্যমান হলো। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বশীল তৎপরতা জেলাবাসীর কাছে স্বস্তির বার্তা দিয়েছে। জনসচেতনতা ও পুলিশের যৌথ প্রচেষ্টায় মাদকমুক্ত সমাজ গঠনের পথ আরও সুগম হবে—এটাই সবার প্রত্যাশা।