পর্যটক শুন্য সেন্টমার্টিনে, হতাশ পর্যটন ব্যবসায়ীরা

আব্দুর রহমান:

চলতি পর্যটন মৌসুমে ১ নভেম্বর থেকে শর্তসাপেক্ষে দেশের অন্যতম পর্যটন এলাকা প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু গত ১০ দিন চলে গেলেও বিভিন্ন অযুহাতে জাহাজ মালিকরা পর্যটক নিয়ে যায়নি সেন্টমার্টিন।

এমনিতে ১২ মাসের মধ্যে ৯ মাস পর্যটন যাওয়ার ওপর বিধিনিষেধ থাকায় পর্যটক যাওয়া বন্ধ থাকে। তিন মাসের জন্য খুলে দেওয়া হলেও গত ১০ দিনেও কোনো পর্যটক না যাওয়ায় পর্যটক শুন্য এখনো সেন্টমার্টিন। এতে করে সেন্টমার্টিনের পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা হতাশ হয়ে পড়েছেন।

বর্তমান মৌসুমের জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ করে পর্যটকদের জন্য সেন্টমার্টিনকে সাজালেও এ অবস্থায় তা মাটে মারা যাবার উপক্রম হয়েছে। কক্সবাজার-সেন্টমার্টিন নৌরুটে দুটি জাহাজকে প্রশাসন চলাচলের অনুমতি দিলেও গত ১০ দিনেও কোনো জাহাজ যায়নি। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য জমছে না। খাঁ খাঁ করছে জেটিঘাট। এতে দ্বীপে সংকট বেড়েছে। হতাশ দ্বীপবাসীর দাবি, বিধি-নিষেধ শিথিল করা না হলে আর্থিক সংকট আরও বাড়বে।

বিষাদে ভরা পুরো সেন্টমার্টিন দ্বীপ। নেই কোনো ভিড়; ফাঁকা হোটেল, রেস্টুরেন্ট আর জনশূন্য সৈকত। জেটিতেও নেই জাহাজের হুইসেল। সবখানে একরাশ সুনশান নীরবতা।

দ্বীপবাসীর অভিযোগ, আগে অক্টোবর থেকেই পর্যটক আসা শুরু হলেও গত বছর থেকে পরিবেশ রক্ষার নামে নানা বিধিনিষেধে থমকে গেছে পর্যটন। এবারও নভেম্বরের শুরুতে ভ্রমণ উন্মুক্ত হলেও জাহাজ চলাচল না করায় পর্যটকের দেখা মেলেনি। আগে চার মাস ব্যবসা করে সারাবছর সংসার চললেও এখন মাত্র দুই মাসের আয়েই টিকে থাকতে হচ্ছে। অভাব-অনতনে অনেকেই জীবিকার খোঁজে দ্বীপ ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন।

দ্বীপের বাসিন্দা জসিম উদ্দিন বলেন, “দ্বীপে জেটিঘাটে আমার দুটি দোকান। কর্মচারী রয়েছে ৩ জন। এখন দোকান ভাড়া দিতে পারছি না। কর্মচারী ও আমার চলতে কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এমন লোকসানে আছি, একবেলা খেতে পারলে অন্য বেলায় খেতে পারছি না। শুধু আমি না, এখানকার হোটেল, রেস্তোরাঁ কিংবা দোকানদার—সবাই লোকসানে আছে।”

দ্বীপের আরেক বাসিন্দা জিয়া খান বলেন, “গত বছর ২ মাস পর্যটন মৌসুম পেয়েছিলাম। তখন আয় রোজগার হয়েছিল। যা দিয়ে সর্বোচ্চ ৩ থেকে ৪ মাস সংসার চালিয়েছি। কিন্তু এরপর থেকে দুর্ভিক্ষ নেমে এসেছে আমাদের জীবনে।”

দ্বীপের ইজিবাইক চালক মো: রহিম বলেন, “দ্বীপে পর্যটক না আসায় অনেক কষ্ট হচ্ছে। সারাদিন গাড়ি চালিয়ে ব্যাটারি চার্জের বিলও উঠে আসছে না। ব্যাটারি চার্জের বিল ৫০০ টাকা, আর সারাদিন গাড়ি চালিয়ে ২০০ টাকাও আয় হয় না। কারণ এখানে সবাই স্থানীয়। পর্যটক আসলে তো আয় হয়।”

সেন্টমার্টিনে হোটেল, মোটেল ও রেস্টুরেন্ট মিলিয়ে দুই শতাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থাকলেও পর্যটক না থাকায় পড়েছে চরম মন্দায়।

দ্বীপের সী প্রবাল বিচ রিসোর্টের পরিচালক আব্দুল মালেক বলেন, “পর্যটক না আসায় হোটেল-মোটেলগুলো বেহাল অবস্থায় পড়ে আছে। কাজ কর্মেও হাত দেওয়া যাচ্ছে না। আমরা অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছি। জাহাজ কখন ছাড়বে তা জানা নেই। গতবছরও নভেম্বরে জাহাজ দিনে গিয়ে দিনে ফেরার নির্দেশনা থাকলেও একদিনের জন্যও জাহাজ ছাড়েনি। এবছরও একই অবস্থায়। এমন পরিস্থিতিতে আমরা ভালো নেই।”

সেন্টমার্টিন হোটেল-রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির সভাপতি এম এ রহিম জিহাদী বলেন, “সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী নভেম্বরেই পর্যটকরা দ্বীপে যেতে পারবে, কিন্তু থাকতে পারবে না। যার কারণে দ্বীপবাসীর মাঝে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। মানুষের আয়ের প্রধান উৎস হচ্ছে পর্যটন। এই পর্যটন মৌসুমে নভেম্বরেও জাহাজ চলাচল না করায় আয়ের পথ বন্ধ। অনেক মানুষ অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে।”

এ বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ শাহিদুল আলম বলেন, “সরকারের দেওয়া সিদ্ধান্ত মোতাবেক চলতি মৌসুমে ১ নভেম্বর থেকে সেন্টমার্টিনে পর্যটক নিয়ে যাওয়ার জন্য জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। আশা করি পর্যটকরা সেভাবেই সেন্টমার্টিনে চলাচল করবে। এর বাইরে কোনো সুযোগ নেই।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *