নাটোর প্রতিনিধি:
কৃষকই দেশের প্রাণ। আর আমাদের নাটোর কৃষির প্রাণ। অথচ ইরি আবাদের এই ভরা মৌসুমে ইরান-আমেরিকা যুদ্ধের কারণে একজন কৃষককে এক বা দুই লিটারের বেশি ডিজেল দেওয়া হচ্ছে না। অথচ অবৈধভাবে পুকুর কাটা মাটি বহনের ট্রলির জন্য শত শত লিটার ডিজেল ব্যবহার করা হচ্ছে।
একজন কৃষক সবচেয়ে ছোট স্কিম করলেও প্রতিদিন কমপক্ষে তিন থেকে পাঁচ লিটার ডিজেল প্রয়োজন। যেখানে বৈধ এবং অতি আবশ্যক কাজের জন্য এক বা দুই লিটারের বেশি ডিজেল দেওয়া হচ্ছে না।
সেখানে অবৈধ কাজে ব্যবহারের জন্য শত শত লিটার ডিজেল কীভাবে বিক্রি হতে পারে? এ দৃশ্য নাটোর জেলার নলডাঙ্গা উপজেলায়। এলাকায় অসহায় কৃষক ভাইয়েরা দ্রুত এর প্রতিকার চান। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অতি দ্রুত যেন এর ব্যবস্থা গ্রহণ করেন—কৃষকদের এটাই দাবি।
পুকুর খনন সিন্ডিকেটের বেড়াজালে পড়ে যাচ্ছে কৃষক ও নাটোরের কৃষি। জ্বালানি সংকটের বড় অংশ খেয়ে ফেলছে এই পুকুর খনন সিন্ডিকেট গ্রুপ। যেখানে প্রশাসনের একরকম অসহায়ত্ব লক্ষণীয়। উপজেলার বিপ্রবেলঘরিয়া, মাধনগর, খাজুরাসহ বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ পুকুর খনন ও মাটি বিক্রির ফলে কোটি কোটি টাকার সড়ক অচল হয়ে পড়েছে।
কৃষক নজরুল ইসলাম ও ফিরোজ প্রামানিক বলেন, আমরা ফসল চাষ করব, আমাদের সামান্য তেল দিচ্ছে; আর মাঠের মধ্যে ভেকু দিয়ে অনেক তেল নিয়ে গিয়ে সারারাত ধরে মাটি কাটছে। ট্রাক্টর, কাঁকড়া দিয়ে মাটি পরিবহন করছে। তাদের কারণে আমরা তেল পাচ্ছি না। তারাই তেলের সংকট তৈরি করছে। আমাদের লাগবে দশ লিটার, দিচ্ছে মাত্র দুই লিটার করে। স্থানীয় পর্যায়ে ডিজেলের সংকটের কারণ যারা পুকুর খনন করছে বা ভেকু চালাচ্ছে, তারা অনেক তেল নিয়ে যাচ্ছে। এই তেল নিয়ে যাওয়ার কারণে ভুক্তভোগী কৃষক যারা ধান সেচ করছে, তারা তেল পাচ্ছে না। যারা পুকুর খনন করে, ভেকু ও কাঁকড়া চালায় তারা শত শত লিটার তেল নিয়ে যাচ্ছে, যার কারণে আমরা কৃষক ১-২ লিটার করে তেল পাচ্ছি। আমাদের প্রয়োজন ফসল উৎপাদন করা। আর এই ফসল উৎপাদন করতে না পারলে কী পরিমাণ খাদ্য সংকট পড়বে তা আপনারা ভেবে দেখেন। আমাদের একটাই অনুরোধ—আমরা যাতে তেল পাই, সেদিকে দৃষ্টিকোণ রাখা।
এদিকে এই উপজেলায় বিগত ১০ বছরে কমেছে প্রায় ৮০০ বিঘার চেয়ে বেশি কৃষিজমি। প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে, প্রশাসনের নাকের ডগায় বসে নির্বিচারে পুকুর খনন ও অন্যান্য স্থাপনা এবং ফসলি জমিসহ পুকুর সংস্কারের নামে চলছে পুকুর খনন। ফলে কমে গেছে কৃষিজমি।
বর্তমানে সরকারের সময়েও তার ব্যতিক্রম নয়। উপজেলা প্রশাসনের কঠোর হুঁশিয়ারির পরও কিছুতেই কমছে না পুকুর খননের নামে মাটি বিক্রি। ইতিমধ্যে উপজেলা প্রশাসন অভিযান চালিয়ে একাধিক পুকুর খনন বন্ধ করেছে এবং ভেকুর ব্যাটারি জব্দ করেছে।
নলডাঙ্গা উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০১৪ সালে উপজেলায় কৃষিজমির পরিমাণ ছিল ১৪ হাজার ৬৫ হেক্টর, যা কমে ২০২৪ সালে দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৯৬০ হেক্টর জমি। সেই সঙ্গে সংকুচিত হয়েছে দেশের গভীরতম হালতিবিল। উপজেলায় পুকুর খননের মহোৎসব চললেও তা কিছুতেই রোধ করা যায়নি। অভিযোগ উঠেছে, প্রশাসনের এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর পরোক্ষ যোগসাজশে চলেছে এমন অপকর্ম।
আইন-কানুনের তোয়াক্কা না করে অবৈধভাবে পুকুর খনন করায় কমে যাচ্ছে আবাদি জমি। এতে কৃষিজমিতে স্থায়ী জলাবদ্ধতাসহ চাষাবাদের স্থায়ী ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন কৃষকরা এবং পাকা সড়কে পুকুরের মাটি পড়ে পরিণত হয়েছে কাঁচা সড়কে।
ফসলি জমিতে পুকুর খননে স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা থাকলেও সে আইনের তোয়াক্কা করেনি কেউই। ফলে আবাদি জমির পরিমাণ কমে যাওয়া সহ খননকৃত পুকুরের পাশে শত শত বিঘা জমিতে স্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এ ছাড়া ইচ্ছেমতো নষ্ট করা হচ্ছে দেশের সবচেয়ে গভীর জলাশয় হালতিবিলকে। বিলের ঠিক মাঝখানে ঠাঁই দাঁড়িয়ে রয়েছে হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট এবং এখনও বিলে কৃষিজমিতে স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে।
সে সময় স্থানীয় প্রশাসনের পাশাপাশি বিলপারের মানুষ বাধা দিলেও নেতাদের দাপটে সেটি আর থামানো যায়নি। যার ফলে বিলের স্বাভাবিক নৌ-চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি নষ্ট করা হয়েছে কৃষিজমি।
বর্ষাকালে দেশি প্রজাতির অন্তত শতাধিক প্রজাতির মাছের আধার তৈরি হয় এই হালতিবিলে। উন্মুক্ত জলাশয় থেকে মাছ শিকার করে জীবন-জীবিকা চলে বিল দুটির অন্তত লক্ষাধিক মানুষের। কিন্তু বিলের মাঝখানে বেসরকারি এমন স্থাপনায় পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি মাছের স্বাভাবিক প্রজনন নষ্ট করছে। এতে করে ব্যাহত হচ্ছে মাছ উৎপাদন। বর্তমানে উপজেলায় পুকুর রয়েছে সাড়ে ৩ হাজার। যার মধ্যে বিপ্রবেলঘরিয়া ও পিপরুল ইউনিয়নে বেশি।
হালতিবিলের যে অর্থনৈতিক গুরুত্ব, তা হয়তো দিন দিন শেষ করা হচ্ছে এমন সব স্থায়ী অবকাঠামো তৈরি করে। পুকুর খনন বন্ধে বিগত সময়ে কৃষকরা মানববন্ধনের মতো প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করলেও বন্ধ হয়নি নির্বিচারে পুকুর খনন। নির্বিচারে পুকুর খনন ও স্থানীয় স্থাপনা নির্মাণের ফলে প্রভাব পড়ছে বিল অঞ্চলের নানা পেশার মানুষের ওপর। তাই উপজেলায় ফসলি জমিতে পুকুর খনন বন্ধ ও হালতিবিল রক্ষায় নতুন আর কোনো স্থাপনা নির্মাণ না করে হালতিবিলকে সংকটাপন্ন হিসেবে ঘোষণার দাবি বিলপারের মানুষের।
স্থানীয় এলাকাবাসী ও নলডাঙ্গা উপজেলার কৃষক পাভেল হোসেন, কার্তিক চন্দ্র, সন্তেষ প্রামানিক, সুনিল চন্দ্র, মিন্টু, মনুসহ অনেকে জানান, নলডাঙ্গা উপজেলার হাজার হাজার কৃষকের সংসার চলে মাঠের ফসল উৎপাদন করে। পুকুর খনন করার কারণে সড়কের বেহাল অবস্থার সৃষ্টি হয়। উপজেলার কিছু প্রভাবশালীর কারণে মাটি ব্যবসায়ীরা এসব কাজ করে থাকে। জরুরি ভিত্তিতে প্রশাসনের কাছে দাবি—হালতিবিলসহ উপজেলার কোথাও যেন কোনোভাবেই পুকুর খনন করতে দেওয়া না হয়।
এ ছাড়া সাম্প্রতিক ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের একটি প্রতিনিধি দল নাটোরের হালতিবিলে কৃষি কার্যক্রম পরিদর্শন করেছেন এবং নলডাঙ্গা উপজেলার হালতিবিল ব্লকের বিভিন্ন কৃষিজমি ও ফসল পরিদর্শন করেন তারা। পরিদর্শন শেষে মার্কিন প্রতিনিধি দলের প্রধান মিস সারাহ জেলেস্কি ও মার্কিন দূতাবাস কর্মকর্তা তানভীর আহমেদ হালতিবিলের কৃষকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
উপজেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য মতে, উপজেলায় পুকুর রয়েছে সাড়ে ৩ হাজার। উপজেলার ৫টি ইউনিয়নের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পুকুর রয়েছে বিপ্রবেলঘরিয়া ও পিপরুল ইউনিয়নে।
নলডাঙ্গা উপজেলা কৃষি অফিসার মো. সবুজ আলী বলেন, কোনোভাবেই কৃষিজমি পুকুরের আওতায় আনা যাবে না। আইনগতভাবে নিষিদ্ধ রয়েছে। কৃষিজমিতে পুকুর খনন বন্ধে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পুকুর খনন বন্ধে কৃষি বিভাগ কৃষকদের সঙ্গে কাজ করছে।
নলডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আল এমরান খাঁন জানান, কৃষিজমি খনন করে পুকুর খনন চলবে না। মাটি কাটার বিষয়ে উপজেলা প্রশাসন কঠোর অবস্থানে আছে। সব সময় আমরা প্রস্তুত আছি, অভিযান চলবে।