স্টাফ রিপোর্টার:
বরিশাল জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসের রেকর্ড কিপার মোঃ রফিকুল ইসলাম–এর বিরুদ্ধে ভয়াবহ দুর্নীতি, ঘুষ গ্রহণ ও সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীর ভাষায়, একজন সাধারণ রেকর্ড কিপার হয়েও রফিকুল ইসলাম কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন—ঢাকায় দুটি ফ্ল্যাট, বরিশালে একটি বিশাল ভবন ও বিপুল পরিমাণ অজানা সম্পদের মালিকানা তার নামে রয়েছে।
অভিযোগকারী মোঃ মাহবুব আলম জানান, রফিকুল ইসলাম তার আইনসঙ্গত জমির রেকর্ড সংশোধনের নামে ঘুষ দাবি করেন এবং পরবর্তীতে তার মালিকানাধীন ভূমির একটি অংশ প্রতারণামূলকভাবে অন্যের নামে বুঝিয়ে দেন। বিষয়টি ১৯৫০ সালের প্রজাস্বত্ব আইনের ৪২ (ক) ধারার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলেও উল্লেখ করেছেন মাহবুব আলম।
তার ভাষায়,
“আমি বি.এস.ডি.পি. খতিয়ান নং ৭৮২ ও ১০৬৫–এর বৈধ মালিক। দলিল, রেকর্ড ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আমার নামে থাকলেও রেকর্ড কিপার রফিকুল ইসলাম ৪ শতাংশ জমি বিপক্ষ পক্ষকে দিয়ে দেন। এ কাজের বিনিময়ে তিনি মোটা অঙ্কের ঘুষ নেন।”
তিনি আরও বলেন,
“রফিকুল ইসলাম আমার কাছ থেকে ৪% জমির বিনিময়ে ঘুষ দাবি করেন এবং তা না দিলে রেকর্ডে পরিবর্তন না করার হুমকি দেন। আমি একজন সাধারণ মানুষ, আমার পৈতৃক সম্পত্তি অন্যের হাতে তুলে দেওয়ার এই অন্যায় মেনে নিতে পারি না। আমি এর বিচার চাই।”
অভিযোগে আরও উঠে এসেছে যে, রফিকুল ইসলাম শুধু মাহবুব আলমের নয়, বরিশাল জোনের বিভিন্ন দরখাস্তকারী ও ভূমি মালিকদের কাছ থেকেও ঘুষ গ্রহণ করে রেকর্ড পরিবর্তন ও রায়প্রদানের প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করেন।
বিশেষ করে ভোলা জেলার লালমোহন উপজেলার লাঙ্গলকাঠি এলাকার জাহাঙ্গীর মিয়া–এর জমি নিয়েও রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সূত্র জানায়, রফিকুল ইসলাম ওই এলাকার জাহাঙ্গীর মিয়ার কাছ থেকে ১ লক্ষ ১০ হাজার টাকা ঘুষ নিয়ে রেকর্ড সংশোধনের আশ্বাস দিয়েছিলেন, কিন্তু পরে কাজ সম্পন্ন না করে বারবার তালবাহানা করতে থাকেন।
জানাগেছে, রফিকুল ইসলাম বর্তমানে বরিশাল শহরে একটি বহুতল ভবনের মালিক, যা তার সরকারি চাকরির বেতন কাঠামোর সঙ্গে একেবারেই অসামঞ্জস্যপূর্ণ। শুধু তাই নয়, তিনি ঢাকায়ও দুটি ফ্ল্যাটের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন—“মাত্র রেকর্ড কিপার হয়েও তিনি কীভাবে কোটি কোটি টাকার সম্পত্তির মালিক হলেন?”
একজন স্থানীয় ভূমি দপ্তরের কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“রফিকুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে সেটেলমেন্ট অফিসে থেকে জনগণের রেকর্ড সংশোধনের নামে টাকা নেয়। যারা টাকা দেয় না, তাদের কাগজে ত্রুটি দেখিয়ে মাসের পর মাস ঘোরায়। অনেক ক্ষেত্রেই ঘুষ ছাড়া ফাইল এগোয় না।”
অভিযোগকারী মাহবুব আলম বলেন,
“আমি সরকারের উচ্চ পর্যায়ে এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কাছে রফিকুল ইসলামের সম্পদের হিসাব তদন্তের আবেদন জানাব। একজন রেকর্ড কিপার হয়ে সে কিভাবে এমন বিলাসবহুল জীবন যাপন করছে, তার উৎস খুঁজে বের করতে হবে।”
তিনি আরও বলেন,
“আমার বৈধ ৮ শতাংশ জমির সঠিক রেকর্ড পুনঃপর্যালোচনা করার জন্য বরিশাল জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসের কর্মকর্তাদের প্রতি অনুরোধ জানাচ্ছি। আমি চাই আমার ন্যায্য সম্পত্তি ফেরত পাই এবং রফিকুল ইসলামের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক।”
এদিকে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বরিশাল জোনাল অফিসে রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে এর আগেও একাধিক মৌখিক ও লিখিত অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু প্রভাবশালী একটি মহলের ছত্রছায়ায় থেকে তিনি সব অভিযোগ এড়িয়ে যান। ফলে দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ জনগণ হয়রানির শিকার হলেও দপ্তরে দুর্নীতির এই সংস্কৃতি থামছে না।
একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলেন,
“এখন বরিশাল জোনাল অফিসে রফিকুল ইসলাম নামটা শুনলেই মানুষ আতঙ্কিত হয়। কেউ রেকর্ড ঠিক করতে গেলে ঘুষ ছাড়া কাজ হয় না। ছোট একটি খতিয়ান সংশোধনের জন্য লাখ টাকার দাবি করা হয়—এটা প্রকাশ্য গোপন বিষয়।”
ভুক্তভোগীরা দাবি করেছেন, এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দ্রুত দুদক, ভূমি মন্ত্রণালয় ও জোনাল প্রধান অফিসের তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। পাশাপাশি তার নামে থাকা সমস্ত সম্পত্তি—ঢাকা ও বরিশালের ভবন ও ফ্ল্যাট—অবৈধ সম্পদ হিসেবে জব্দ করে তদন্তের আওতায় আনা হোক।
ভূমি দপ্তরের একটি অভ্যন্তরীণ সূত্র জানিয়েছে, রফিকুল ইসলাম সম্প্রতি তার বেশ কিছু সম্পত্তি আত্মীয়দের নামে হস্তান্তরের চেষ্টা করছেন, যাতে ভবিষ্যতে তদন্ত শুরু হলে তা গোপন রাখা যায়।
অভিযোগকারী মাহবুব আলম বলেন,
“আমি দুর্নীতিবাজদের ভয় পাই না। এই রেকর্ড কিপার শুধু আমার ক্ষতি করেনি—সে সরকারের ভাবমূর্তি কলঙ্কিত করেছে। আমি চাই, তার বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেয়া হোক যাতে ভবিষ্যতে আর কেউ এভাবে জনগণের জমি কেড়ে নিতে না পারে।”
অবশেষে ভুক্তভোগী ও স্থানীয় জনগণের একটাই দাবি — বরিশাল জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসের রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হোক।
এ ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশনের পাশাপাশি ভূমি মন্ত্রণালয়ের বিশেষ টিমকেও তদন্তে নামার আহ্বান জানিয়েছে স্থানীয় সচেতন মহল।
তাদের ভাষায়,
“দলিলের ন্যায্য মালিকের জমি যদি ঘুষের বিনিময়ে হাত বদল হয়, তবে সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে?”