স্টাফ রিপরতার:
রাজধানীর বিআরটিএ প্রধান কার্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলমান প্রশাসনিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও অর্ধসরকারি সূত্রে উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে। অভিযোগ অনুযায়ী, মোটরযান পরিদর্শক আবু পলাশ (ইঞ্জিঃ) তার চাকরির সুবাদে পরিবারসহ কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ গড়ে তুলেছেন। তিনি আওয়ামী লীগের সরকারের আমলে ছাত্রলীগের ক্যাডার পরিচয়ে বিআরটিএতে যোগদান করেন এবং মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের ছত্রছায়ায় দেশের বিভিন্ন বিআরটিএ অফিসে দালাল নিয়োগের মাধ্যমে প্রতিমাসে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। এই অভিযোগ ইতিমধ্যেই বিভিন্ন দপ্তরে লিখিতভাবে দাখিল করা হয়েছে, কিন্তু সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টা, সচিব, চেয়ারম্যান ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছেন।
দপ্তরের সাধারণ কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা জানান, কর্মকর্তার এ ধরনের কর্মকাণ্ড দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে এবং তা সাধারণ প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে। সূত্র মতে, আবু পলাশ সারা দেশে বিআরটিএর অফিসগুলোতে দালাল নিয়োগের মাধ্যমে তদবির ব্যবসা চালাচ্ছেন, যা মাসিক লক্ষাধিক টাকা আয়ের পথ তৈরি করছে। এ ছাড়া, তিনি সাংবাদিকদের ওপর হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করে তার অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করছেন। এই পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা কেন পদক্ষেপ নিচ্ছেন না, তা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হিসেবে উঠে এসেছে।
আবু পলাশের স্থায়ী ঠিকানা, জাতীয় পরিচয়পত্র ও আয়কর নথি সম্পর্কেও অনিয়ম রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তার আয়কর নথিতে কুষ্টিয়ার সেনগ্রামের ঠিকানা দেখানো হলেও বাস্তবে তিনি রাজবাড়ীর পাংশার পূর্ব বালিয়ায় জন্মগ্রহণ করেছেন এবং বর্তমানে উত্তরায় নিজ ফ্ল্যাটে বসবাস করছেন। ২০১৪ সালের জুন মাসে সহকারী মোটরযান পরিদর্শক হিসেবে যোগদানের পর ২০২২ সালে মোটরযান পরিদর্শক পদে পদোন্নতি লাভ করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, যোগদানের পর থেকে তিনি ঘুষ, তদবির ও দালাল নিয়োগের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার মালিকানা গড়ে তুলেছেন। সর্বশেষ জামালপুরের কর্মস্থল থেকে ঘুষ ও দুর্নীতির দায়ে প্রত্যাহার করা হলেও প্রধান কার্যালয়ে পুনঃসংযুক্ত করা হয়েছে।
অবৈধ সম্পদের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ব্যাংকে কোটি কোটি টাকা, কুষ্টিয়াতে ছয় তলা ভবন, রাজধানী ও দেশের বিভিন্ন স্থানে ফ্ল্যাট এবং স্বর্ণের বিশাল পরিমাণ। আয়কর বিবরণীতে ২০২৩ সালে তার সম্পদ মাত্র ৬০,৪০,২৪৬ টাকা দেখানো হয়েছে, তবে বাস্তবে তার সম্পদের পরিমাণ এই প্রদত্ত অর্থের চেয়ে অনেক বেশি। এছাড়া তার স্ত্রীর নামে বিভিন্ন জায়গায় কোটি কোটি টাকার সম্পদ এবং দুটি মাইক্রোবাস ও দুটি প্রাইভেটকার রয়েছে, যা রেন্ট-এ-কারে ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব তথ্যও তার আয়কর নথিতে প্রকাশিত হয়নি।
সাক্ষাত্কার ও স্থানীয় সূত্রের ভিত্তিতে জানা গেছে, আবু পলাশের এ ধরনের কর্মকাণ্ড বিআরটিএ প্রধান কার্যালয়ের অনুমোদন বা অন্তত অগোছালো নজরদারির সুযোগে দীর্ঘদিন ধরে চলেছে। দালাল নিয়োগ, ঘুষ নেওয়া, তদবির ব্যবসা এবং সম্পদের গোপন রাখা, এসব কর্মকাণ্ড প্রশাসনিক দুর্বলতা ও রাজনৈতিক ছত্রছায়ার কারণে সম্ভব হয়েছে। অভিযোগকারীরা মনে করেন, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অবহেলা এবং তদন্তের অভাব দেশের প্রশাসনিক স্বচ্ছতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
সংশ্লিষ্ট দপ্তরের বিভিন্ন কর্মকর্তা জানান, বিষয়টি নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন হলেও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ ও কোর্টে প্রমাণের অভাবের কারণে সরাসরি পদক্ষেপ নেয়া কঠিন। একই সঙ্গে তারা এও উল্লেখ করেছেন যে, সংবাদমাধ্যম ও স্থানীয় পর্যায়ের অনুসন্ধান আবু পলাশের কর্মকাণ্ডকে প্রকাশ করতে পারে, যা প্রমাণভিত্তিক তথ্য ও নথি সংগ্রহ না করা পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া কঠিন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রশাসনিক দুর্নীতি, দালাল নিয়োগ এবং তদবির ব্যবসা বন্ধ করতে হলে কঠোর আইনি পদক্ষেপ, স্বচ্ছ তদন্ত এবং যথাযথ নথিপত্রের যাচাই অপরিহার্য। তারা আরও বলেন, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের উদাসীনতা বা রাজনৈতিক প্রভাব দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে বাধা সৃষ্টি করছে।
এই পরিস্থিতিতে নাগরিক ও কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি সাধারণ উদ্বেগ তৈরি হয়েছে যে, দালাল নিয়োগ ও তদবির ব্যবসা দীর্ঘদিনের অভ্যাস হয়ে গেছে এবং তা দেশের প্রশাসনিক কার্যক্রমকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। স্থানীয় সূত্র মতে, আবু পলাশ ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদের একটি বড় অংশ এখনও গোপন রাখা হয়েছে। সাংবাদিক ও স্থানীয় প্রশাসনের সূত্র থেকে জানা যায়, আরও কিছু সম্পদের তথ্য প্রকাশিত হতে পারে, যা অনুসন্ধান ও প্রমাণের পর জনগণকে অবহিত করা যেতে পারে।
এই ধরনের অভিযোগ ও অনুসন্ধানমূলক তথ্যের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অবিলম্বে প্রমাণভিত্তিক তদন্ত, দায়ী কর্মকর্তাদের জবাবদিহি এবং সম্পদের উৎস ও বৈধতার যাচাই দেশের স্বাভাবিক প্রশাসনিক পরিবেশ নিশ্চিত করবে। এ ছাড়া, এ ধরনের অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করলে জনগণকে সচেতন করা সম্ভব হবে এবং ভবিষ্যতে অনিয়ম প্রতিরোধে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
উপসংহারে বলা যায়, বিআরটিএ প্রধান কার্যালয়ে অভিযোগকৃত দালাল নিয়োগ ও তদবির ব্যবসা প্রশাসনিক দুর্বলতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং নজরদারির অভাবের কারণে দীর্ঘদিন ধরে চলমান। প্রমাণভিত্তিক অনুসন্ধান, স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তা এবং যথাযথ আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ ছাড়া এই সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের এখনই উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে, না হলে দেশের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও নাগরিক আস্থা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।