মোহাম্মদ হোসেন হ্যাপী:
নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ ইউনিয়ন ভূমি অফিসে বিতর্কিত সহকারী ভূমি কর্মকর্তা দুলাল চন্দ্র দেবনাথকে পদায়নের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। দুর্নীতি, ঘুষ বাণিজ্য ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তাকে গুরুত্বপূর্ণ এই অফিসে পদায়ন করায় এলাকাবাসী উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
জানা যায়, গত বুধবার (৪ মার্চ) সকাল ৯টার দিকে হঠাৎ করে সিদ্ধিরগঞ্জ ইউনিয়ন ভূমি অফিস পরিদর্শনে আসেন ভূমি প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। পরিদর্শনের সময় তিনি অফিসে কোনো কর্মকর্তাকে উপস্থিত না পেয়ে প্রায় ৩০ মিনিট অপেক্ষা করেন। পরে সকাল পৌনে ১০টার দিকে সিদ্ধিরগঞ্জ ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তা অফিসে উপস্থিত হন। এ সময় তাদের দেরিতে আসার কারণ জানতে চান প্রতিমন্ত্রী। কিন্তু কর্মকর্তাদের কাছ থেকে সন্তোষজনক জবাব না পেয়ে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
ঘটনার পরপরই কর্তৃপক্ষ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে সিদ্ধিরগঞ্জ ইউনিয়নের সহকারী ভূমি কর্মকর্তা নাসির উদ্দিন, উপ-সহকারী ভূমি কর্মকর্তা ওমর ফারুক এবং অফিস সহকারী ফাতেমা জান্নাতিকে বদলি করে দেয়। তবে ওই বদলির একদিন পরই সিদ্ধিরগঞ্জ গোদনাইল ইউনিয়ন ভূমি অফিসের বিতর্কিত সহকারী ভূমি কর্মকর্তা দুলাল চন্দ্র দেবনাথকে সিদ্ধিরগঞ্জ ইউনিয়ন ভূমি অফিসে পদায়ন করা হয়। এ খবর ছড়িয়ে পড়তেই স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, দুলাল চন্দ্র দেবনাথ দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন স্থানে দায়িত্ব পালনকালে ঘুষ বাণিজ্য, গ্রাহক হয়রানি এবং দালালচক্রের মাধ্যমে অবৈধ সুবিধা নেওয়ার সঙ্গে জড়িত। তাদের দাবি, গোদনাইল ইউনিয়ন ভূমি অফিসে দায়িত্ব পালনকালে তিনি জমি সংক্রান্ত কাজের জন্য আসা সাধারণ মানুষের কাছে মোটা অঙ্কের ঘুষ দাবি করতেন। চাহিদামতো টাকা না দিলে বিভিন্ন অজুহাতে ফাইল আটকে রাখা, হয়রানি করা এবং কাজ বিলম্বিত করার মতো অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, “আগে চোর ছিল, এখন ডাকাত আসছে।” এমন মন্তব্য করে তারা বলেন, বিতর্কিত এই কর্মকর্তাকে সিদ্ধিরগঞ্জে পদায়ন করায় সাধারণ মানুষ আরও ভোগান্তিতে পড়বে।
এলাকাবাসীর দাবি, দুলাল চন্দ্র দেবনাথ অতীতে নারায়ণগঞ্জের বক্তাবলী এলাকায় দায়িত্ব পালনকালে সেখানকার বাসিন্দাদেরও ব্যাপক হয়রানি করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, তার আচরণে অতিষ্ঠ হয়ে পড়লে এলাকাবাসীর তীব্র প্রতিবাদের মুখে কর্তৃপক্ষ তাকে সেখান থেকে সরিয়ে নেয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন তদবিরের মাধ্যমে তিনি সিদ্ধিরগঞ্জের গোদনাইল ইউনিয়ন ভূমি অফিসে বদলি হয়ে আসেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গোদনাইল ইউনিয়ন ভূমি অফিসে যোগদানের পর থেকেই তিনি একটি শক্তিশালী দালাল সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। ওই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে জমির নামজারি, খতিয়ান সংশোধনসহ বিভিন্ন কাজের জন্য সাধারণ মানুষের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, এক পর্যায়ে তিনি এক নারীকে কুপ্রস্তাবও দেন। এ ঘটনায় ওই নারী নারায়ণগঞ্জের তৎকালীন জেলা প্রশাসক জাহিদুর আলমের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগটি তদন্তের জন্য এলএ শাখার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মৌসুমি আক্তারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। শুধু ওই নারীই নয়, আরও কয়েকজন ভুক্তভোগী তার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেছেন বলে জানা গেছে। তবে রহস্যজনকভাবে এসব অভিযোগের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি বলে দাবি এলাকাবাসীর।
কদমতলী এলাকার বাসিন্দা ও ভুক্তভোগী বিল্লাল হোসেন জানান, প্রায় এক বছর আগে তিনি নিজের ক্রয়কৃত চার শতাংশ জমির নামজারি করার জন্য গোদনাইল ইউনিয়ন ভূমি অফিসে যান। সেখানে সহকারী ভূমি কর্মকর্তা দুলাল চন্দ্র দেবনাথ তাকে জানান যে, তার জমিটি অন্য একজনের নামে নামজারি হয়ে গেছে এবং সেটি সংশোধন করতে হলে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা লাগবে। বিল্লাল হোসেন বলেন, “আমি এত টাকা দিতে পারিনি। তাই আজও আমার জমির নামজারি করতে পারিনি।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, দুলাল চন্দ্র দেবনাথ সাধারণ মানুষের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন এবং ঘুষ না দিলে নানা অজুহাতে কাজ আটকে রাখেন। এতে সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
এলাকাবাসীর দাবি, গোদনাইল ইউনিয়ন ভূমি অফিসে দায়িত্ব পালনকালে দুলাল চন্দ্র দেবনাথ ঘুষ বাণিজ্য, গ্রাহক হয়রানি এবং দালাল সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিপুল অর্থের মালিক হয়েছেন। বিভিন্ন সময় এসব অভিযোগ নিয়ে গণমাধ্যমেও সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
সিদ্ধিরগঞ্জবাসী বর্তমান জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবিরের কাছে দুলাল চন্দ্র দেবনাথের পদায়ন বাতিল করে তার বিরুদ্ধে তদন্তপূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, একজন বিতর্কিত কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমি অফিসে দায়িত্ব দিলে সাধারণ মানুষ আরও ভোগান্তিতে পড়বে এবং ভূমি সেবায় স্বচ্ছতা নষ্ট হবে।
এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির বলেন, দুলাল চন্দ্র দেবনাথকে সিদ্ধিরগঞ্জ ইউনিয়ন ভূমি অফিসে আপাতত অস্থায়ীভাবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ঘুষ ও গ্রাহক হয়রানির অভিযোগ খতিয়ে দেখা হবে। পূর্বে তার বিরুদ্ধে কোনো লিখিত অভিযোগ থাকলে সেটিও পর্যালোচনা করা হবে।
তিনি আরও বলেন, “কোনো ভূমি কর্মকর্তা যদি অপরাধ করে থাকেন, তাকে কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না। নারায়ণগঞ্জের প্রতিটি ভূমি অফিস আমাদের নজরদারিতে রয়েছে। কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতি সহ্য করা হবে না।”