বিরল রোগে আক্রান্ত শিশুর পাশে ডিসি জাহিদুল ইসলাম মিঞা

মোহাম্মদ হোসেন হ্যাপী, ব্যুরো চিফ: 

নারায়ণগঞ্জের নয় বছর বয়সী শিশু মান্তাহার মাহমুদ, যিনি এক বিরল রোগে আক্রান্ত হয়ে চলাফেরার ক্ষমতা হারিয়েছেন, তার পাশে দাঁড়িয়েছেন নারায়ণগঞ্জের মানবিক জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। তিনি শিশুটিকে উপহার দিয়েছেন অত্যাধুনিক একটি ইলেকট্রনিক হুইলচেয়ার, যা মান্তাহারের জীবনে নতুন আশার আলো জ্বালিয়েছে। এখন থেকে আর সারাক্ষণ মায়ের কোলে চড়ে যেতে হবে না — নিজের চেষ্টাতেই সে হুইলচেয়ার চালিয়ে চলাফেরা করতে পারবে।

শিশু মান্তাহার নারায়ণগঞ্জ শহরের ইসদাইর এলাকার বাসিন্দা। তার বাবা এনামুল হক একজন গার্মেন্টস শ্রমিক এবং মা মিতু বেগম একজন গৃহিণী। তারা জানান, মান্তাহার একসময় স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করত। কিন্তু হঠাৎ করে তার শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে সমস্যা দেখা দিলে ধীরে ধীরে সে হাঁটা-চলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। চিকিৎসকেরা পরে নিশ্চিত করেন যে, শিশুটি Duchenne Muscular Dystrophy (DMD) নামের এক বিরল ও জটিল রোগে আক্রান্ত হয়েছে—যার চিকিৎসা বাংলাদেশে নেই, আর বিদেশে করাতে গেলে প্রয়োজন বিপুল অর্থের।

অসহায় এই পরিবারের চিকিৎসার ব্যয় বহনের কোনো সামর্থ্য না থাকায় তারা দ্বারে দ্বারে ঘুরে সহায়তা না পেয়ে শেষ পর্যন্ত আশ্রয় নেন ‘মানবিক ডিসি’ হিসেবে খ্যাত জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞার কাছে। গত ২২ অক্টোবর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে দেখা করতে গেলে মান্তাহারের মা মিতু বেগম অসুস্থ সন্তানকে সারাক্ষণ কোলে নিয়ে ছিলেন। দৃশ্যটি জেলা প্রশাসকের নজরে আসে এবং শিশুটির অসহায় অবস্থা দেখে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।

ডিসি জাহিদুল ইসলাম মিঞা তখনই নগদ অর্থ সহায়তা প্রদান করেন এবং মিতু বেগমকে একটি ইলেকট্রনিক হুইলচেয়ারের জন্য লিখিত আবেদন করতে পরামর্শ দেন। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বুধবার (২৯ অক্টোবর) জেলা প্রশাসক নিজ কার্যালয়ে মান্তাহার ও তার পরিবারকে ডেকে নেন এবং নিজ হাতে শিশুটিকে একটি অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক হুইলচেয়ার উপহার দেন।

হুইলচেয়ার হাতে পেয়ে আনন্দে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে মান্তাহার বলে, “আমি অনেক খুশি। ডিসি অফিসের নিচে রাস্তায় অনেকক্ষণ চেয়ারে বসে চালিয়েছি। এখন আমি মাদরাসায় যেতে পারব, সারাক্ষণ মায়ের কোলেও থাকতে হবে না।”

মিতু বেগম আবেগভরা কণ্ঠে বলেন, “ডিসি স্যার আমাদের সন্তানের জন্য যে কাজটি করেছেন, তা আমরা কোনোদিন ভুলব না। তিনি আমাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, আজ সেই প্রতিশ্রুতি রেখেছেন। উনি সত্যিই একজন মানবিক মানুষ।”

জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. আসাদুজ্জামান সরদার বলেন, “ডিসি জাহিদুল ইসলাম দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই প্রতিবন্ধী শিশু ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কল্যাণে নানা মানবিক উদ্যোগ নিয়েছেন। তিনি শুধু নির্দেশ দেন না, বাস্তব কাজ করে দেখান।”

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, “শিশুটি দেখতে খুব মায়াময়। প্রথম যেদিন ওকে দেখেছিলাম, মনে হয়েছিল ওর জন্য কিছু করা দরকার। আজ যখন দেখলাম সে নিজের হাতে হুইলচেয়ার চালাচ্ছে, তখন মনে হয়েছে — এই সামান্য সহায়তাই হয়তো ওর জীবনে বড় পরিবর্তন আনবে। প্রতিবন্ধী শিশুদের কখনোই বাইরের আলো-বাতাস থেকে বঞ্চিত করা উচিত নয়।”

এ সময় উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোহাম্মদ আলমগীর হোসাইন, জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাবৃন্দসহ জেলা প্রশাসনের অন্যান্য কর্মকর্তারা।

স্থানীয়দের ভাষায়, মানবিক কাজের ধারাবাহিকতায় জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম আবারও প্রমাণ করলেন—প্রশাসনের দায়িত্ব শুধু দাপ্তরিক সীমায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি হতে পারে মানবতারও সর্বোচ্চ প্রকাশ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *