স্বাধীন সংবাদ ডেস্ক:
রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে মঙ্গলবার (৯ ডিসেম্বর) বেগম রোকেয়া দিবস উদযাপনের অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বেগম রোকেয়ার আদর্শ অনুসরণ করে নতুন বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, বেগম রোকেয়া যেভাবে নারীদের ক্ষমতায়নের কথা চিন্তা করেছিলেন, আজ তার সেই চিন্তা ও আদর্শ আমাদের পথ দেখাচ্ছে।
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, “যে আদর্শে বেগম রোকেয়া আমাদের নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, তা আজও সমকালীন প্রাসঙ্গিক। আজকের যে চারজন বিশিষ্ট নারী রোকেয়া পদক পেলেন, তারা সেই আদর্শকে ধরে রেখে আমাদের জাতিকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছেন। এটি কোনো সাধারণ পুরস্কার নয়, এটি যুগান্তকারী পুরস্কার। তারা শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্বে নারীর নেতৃত্বের প্রতীক হয়ে উঠেছেন।”
ড. ইউনূস আরও বলেন, বেগম রোকেয়ার স্বপ্ন ও দিকনির্দেশনা বাস্তবায়নে আমরা যথেষ্ট অগ্রগতি করতে পারিনি। “১০০ বছর পার হলেও আরেকজন রোকেয়া সৃষ্টি করতে পারিনি, এটা আমাদের জন্য দুর্ভাগ্য। আমাদের উচিত খুঁজে বের করা কেন আমরা তার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে ব্যর্থ হয়েছি। আমাদের কথার চেয়ে কাজের বেশি প্রয়োজন।”
উল্লেখযোগ্যভাবে, অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের সময়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে তার শিক্ষকতার সময় এবং গ্রামীণ ব্যাংকের শুরুর দিনগুলোর স্মৃতি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “দুর্ভিক্ষের প্রভাব প্রথমে আসে নারীর ওপর, এরপর শিশুদের ওপর। এই অবস্থায় নারীর শক্তি ও নেতৃত্ব সমাজকে টেকসই করতে বিশেষ ভূমিকা রাখে।”
ড. ইউনূস বেগম রোকেয়ার কাজের মূল বার্তা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “বেগম রোকেয়া কখনো সমাজকে বাদ দিয়ে কোনো কাজ করেননি। সবসময় সমাজকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করেছেন। ১০০ বছর আগে তিনি লিখেছিলেন, নারী ও কন্যাদের শিক্ষিত করতে হবে যেন তারা অন্ন উপার্জন করতে পারে। কিন্তু আমরা এখনও তার থেকে শিখতে পারিনি। আমরা শুধু আয়োজন করি, কিন্তু শিক্ষাকে জীবনধারায় রূপ দিতে পারি না। দৈনন্দিন পথে রোকেয়ার আদর্শকে সঙ্গে নিয়ে চললে আমরা অগ্রগতি নিশ্চিত করতে পারব।”
প্রধান উপদেষ্টা নারী নেতৃত্বের গুরুত্বও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “মেয়েরা গণ-অভ্যুত্থানে তাদের নেতৃত্ব দেখিয়েছে। আজকের নারী সমাজ সেই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী নারী সমাজ। তারা শুধু নারীদের জন্য নয়, সমাজের সকলের জন্য উদাহরণ স্থাপন করছে। নতুন বাংলাদেশের যাত্রা তাদের হাত ধরেই শুরু হয়েছে। নারীদের সামনে রেখে আমাদের অগ্রগতি নিশ্চিত করতে হবে।”
প্রতি বছরের মতো এ বছরও নারীদের শিক্ষা, অধিকার, মানবাধিকার এবং নারী জাগরণে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ চার বিশিষ্ট নারীকে বেগম রোকেয়া পদক প্রদান করা হয়। নারী শিক্ষায় (গবেষণা) রুভানা রাকিব, নারী অধিকারে (শ্রম অধিকার) কল্পনা আক্তার, নারী জাগরণে (ক্রীড়া) ঋতুপর্ণা চাকমা এবং মানবাধিকার ক্ষেত্রে নাবিলা ইদ্রিস এ বছর পদক পান।
এছাড়া অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দেন। তিনি জানান, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নাম পরিবর্তন করে ‘নারী ও শিশু মন্ত্রণালয়’ করা হবে। এটি নারীর ক্ষমতায়ন ও শিশুর কল্যাণে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখার লক্ষ্যে নেওয়া একটি পদক্ষেপ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শারমীন এস. মুরশিদ। স্বাগত বক্তব্য রাখেন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মমতাজ আহমেদ।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বক্তব্য থেকে পরিষ্কার হয়, বেগম রোকেয়ার আদর্শ ও চিন্তাভাবনা শুধু অতীতের নয়, বরং বর্তমান সমাজ ও নতুন প্রজন্মের জন্য প্রাসঙ্গিক। তিনি সবাইকে উদ্বুদ্ধ করেছেন নারীর ক্ষমতায়ন ও শিক্ষার মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশের রূপায়ণে অংশ নিতে। তিনি বলেন, “নারীর নেতৃত্বে আমরা একটি শক্তিশালী, সমৃদ্ধ এবং সমানাধিকারের বাংলাদেশ গড়তে পারি। নারীদের সামনে রেখে আমাদের পরিকল্পনা ও নীতি বাস্তবায়ন করতে হবে।”
অনুষ্ঠানে উপস্থিতরা প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্যকে উদ্দীপক এবং অনুপ্রেরণামূলক হিসেবে উল্লেখ করেন। বিশেষ করে চারজন পদকপ্রাপ্ত নারীর কৃতিত্ব তুলে ধরা হয়, যারা প্রতিটি ক্ষেত্রে উদাহরণ স্থাপন করেছেন।
সংক্ষেপে, বেগম রোকেয়ার আদর্শ, নারীর ক্ষমতায়ন ও নতুন বাংলাদেশের জন্য নারীদের ভূমিকার উপর গুরুত্বারোপ করেই এই অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আহ্বান ছিল স্পষ্ট—নারীর নেতৃত্ব ও সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি নতুন, শক্তিশালী এবং সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।