মোহাম্মদ হোসেন হ্যাপী:
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে সারা দেশে যখন প্রচার-প্রচারণার উত্তাপ তুঙ্গে, তখন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের চিত্র একটু ভিন্ন। এখানে ভোট কেন্দ্রগুলোতে দেখা যাচ্ছে না পরিচিত কোনো প্রতীক—না ধানের শীষ, না ইসলামী দলগুলোর। এই অনুপস্থিতিই ধীরে ধীরে ভোটারদের মধ্যে হতাশা ও দ্বিধার জন্ম দিচ্ছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ৪০ হাজার ৮১৩। এই আসনটি দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। অন্যদিকে, এখানে পাঁচ শতাধিক মাদরাসা থাকা এবং ইসলামী ভাবধারার ভোটারদের উপস্থিতি বিএনপি-সমর্থক ও ইসলামী রাজনৈতিক শিবিরের মধ্যে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। ফলে স্থানীয় ভোটাররা ঐতিহ্যগতভাবে দুই ভাগে বিভক্ত—একদিকে ধানের শীষের সমর্থকরা, অন্যদিকে ইসলামী ধারার দলগুলোর ভোটার।
স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, বিএনপির সমর্থকরা আশা করেছিলেন পরিচিত ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দেবেন, আর ইসলামী ধারার ভোটাররা তাদের পরিচিত প্রতীকে। কিন্তু এবারের নির্বাচনে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।
জোটগত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিএনপি নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনটি ছেড়ে দিয়েছে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রার্থী মনির হোসেন কাসেমীর হাতে, যিনি ‘খেজুরগাছ’ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় জোট কোনো নিজস্ব প্রার্থী না দিয়ে এনসিপির প্রার্থী আব্দুল্লাহ আল আমিনকে ‘শাপলাকলি’ প্রতীক দিয়ে মাঠে নামিয়েছে।
ফলে ভোটের ব্যালটে দেখা যাচ্ছে না ধানের শীষ, নেই পরিচিত ইসলামী দলগুলোর প্রতীকও। এই দুই অনুপস্থিতিই ভোটারদের মধ্যে শূন্যতার অনুভূতি তৈরি করেছে।
স্থানীয় ভোটার ও বিএনপির সমর্থক জুনায়েদ বাবু বলেন,
“দীর্ঘ দেড় যুগ পর ভোট দেওয়ার সুযোগ এসেছে ভেবে আমরা আশাবাদী ছিলাম। আমাদের প্রত্যাশা ছিল ধানের শীষে ভোট দেব। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জোটের কারণে খেজুরগাছকে সমর্থন দিতে বলা হয়েছে। এটা আমাদের চাওয়ার প্রতিফলন নয়।”
অন্যদিকে, ১০ দলীয় জোটের সমর্থক আব্দুল কুদ্দুসও হতাশা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন,
“আমরা চাইছিলাম ইসলামী ধারার কোনো দলের প্রার্থীকে ভোট দিতে। কিন্তু এখানে এনসিপির প্রার্থী দেওয়া হয়েছে। জোটের হিসাব আমরা বুঝি, কিন্তু ভোটার হিসেবে আমরা হতাশ।”
নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের নির্বাচনী মাঠে এখন এক ধরনের মিশ্র অনুভূতি বিরাজ করছে। রাজনৈতিক সমঝোতার অঙ্কে প্রার্থী নির্ধারণ হলেও ভোটারদের আবেগ ও প্রত্যাশা পুরোপুরি প্রতিফলিত হয়নি। পরিচিত প্রতীকের অনুপস্থিতি এই আসনের ভোটের রাজনীতিকে ‘দোদুল্যমান’ পরিস্থিতিতে ফেলে দিয়েছে, যা ভোটের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।
বিএনপির স্থানীয় শাখার যুবদল সদস্যসচিব মশিউর রহমান রনি বলেন,
“দীর্ঘ ১৭ বছর আন্দোলন-সংগ্রামে জুলুম-নির্যাতনের পর বিএনপির সমর্থকদের মধ্যে প্রত্যাশা ছিল ধানের শীষ মার্কায় ভোট দেব। সেই আশা আমাদের পূরণ হয়নি। তবে বিএনপি জোটের প্রার্থী হিসেবে মনির হোসেন কাসেমীকে খেজুরগাছ মার্কায় সমর্থন দিয়েছে। তাই হতাশা চেপে রেখে আমরা খেজুরগাছকেই বিজয়ী করে আনার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করব।”
আলিরটেক মাদরাসার সহকারী প্রিন্সিপাল মাওলানা হাবিবুর রহমান হাবিব বলেন,
“১০ দলীয় জোট থেকে এনসিপিকে সমর্থন দেওয়া হয়েছে। আমাদের আশা পূরণ হয়নি।”
সর্বশেষ দেখা যাচ্ছে, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের ভোটাররা এবার পরিচিত প্রতীকের অনুপস্থিতিতে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলেছেন। রাজনৈতিক সমঝোতার ছায়া থাকলেও ভোটারদের প্রত্যাশা ও আবেগ পুরোপুরি প্রতিফলিত হয়নি, যা আসনের নির্বাচনী মাঠকে করছে এক ভিন্ন মাত্রার, অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে।