স্বাধীন সংবাদ ডেস্ক:
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দেশের রাজনীতিতে এক নতুন গতিধারা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দলীয় চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে আলোচিত পরিবর্তনগুলোর একটি হলো নারী প্রার্থীর সংখ্যা ও উপস্থিতির উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। দীর্ঘদিন ধরে পুরুষপ্রধান রাজনীতির কাঠামোয় সীমিত পরিসরে থাকা নারীরা এবার নেতৃত্বের প্রতিযোগিতায় নতুন উদ্দীপনা, আত্মবিশ্বাস ও শক্তি নিয়ে এগিয়ে আসছেন। নির্বাচনি মাঠে তারা শুধু অংশগ্রহণকারী নন, বরং চমক দেখাতে প্রস্তুত প্রার্থী হিসেবেই নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছেন।
নির্বাচনি প্রচারণা শুরুর আগেই দেশের বিভিন্ন আসনে নারী প্রার্থীরা ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে শুরু করেছেন। মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও তাদের উপস্থিতি নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে।
এবারের নির্বাচনে প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি সারা দেশে মোট ১৩টি আসনে নারী প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে। অন্যদিকে তরুণদের নেতৃত্বে গঠিত নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ঘোষিত ১২৫টি আসনের মধ্যে ১৪টি আসনে নারী প্রার্থী দিয়েছে। দলীয় সূত্র জানায়, পরবর্তী ধাপের মনোনয়নে এনসিপির নারী প্রার্থীর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
এই পরিসংখ্যান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নারী নেতৃত্বকে সামনে আনার একটি প্রবণতার ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে নতুন দল হিসেবে এনসিপির উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী প্রার্থী মনোনয়ন রাজনৈতিক অঙ্গনে বাড়তি আগ্রহ তৈরি করেছে।
বিএনপির নারী প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নাম দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তিনি এককভাবে তিনটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন—দিনাজপুর-৩, বগুড়া-৭ ও ফেনী-১। এছাড়া, মানিকগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আফরোজা খান রিতা, সিলেট-২ আসনে চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও গুম হওয়া নেতা এম ইলিয়াস আলীর সহধর্মিণী তাহসিনা রুশদীর লুনা, ফরিদপুর-২ আসনে সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওয়াবেদ ইসলাম, ফরিদপুর-৩ আসনে মহিলা দলের যুগ্ম সম্পাদক চৌধুরী নায়াব ইউসুফ আহমেদ, নাটোর-১ আসনে ফারজানা শারমিন পুতুল, যশোর-২ আসনে মোছা. সাবিরা সুলতানা, ঝালকাঠি-২ আসনে ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টু, শেরপুর-১ আসনে সানসিলা জেবরিন, ঢাকা-১৪ আসনে সানজিদা ইসলাম তুলি, মাদারীপুর-১ আসনে নাদিরা মিঠু ও মনোনয়ন পেয়েছেন।
ঢাকা মহানগরের ২০টি আসনের মধ্যে বিএনপি একটিতে এবং এনসিপি চারটিতে নারী প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে। দলীয় নেতাকর্মী ও ভোটারদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঢাকার এই পাঁচটি আসন যেন পাঁচ নারী প্রার্থীর জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। এনসিপির হয়ে— ঢাকা-৯ আসনে ডা. তাসনিম জারা, ঢাকা-১৭ আসনে ডা. তাজনূভা জাবীন, ঢাকা-১২ আসনে নাহিদা সারওয়ার নিভা ও ঢাকা-২০ আসনে ইঞ্জিনিয়ার নাবিলা তাসনিদ এবং বিএনপির হয়ে ঢাকা-১৪ আসনে সানজিদা ইসলাম তুলি ভোটের মাঠে লড়বেন। এই পাঁচ নারী প্রার্থী পুরুষ প্রার্থীদের বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামছেন।
ঢাকা-১৪ আসনের বিএনপি প্রার্থী সানজিদা ইসলাম তুলি বলেন, ধানের শীষ উন্নয়নের প্রতীক। এ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করাটা তার জন্য গর্বের বিষয়। দলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, এই মনোনয়ন কোনো বিশেষ উপহার নয়; বরং জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে আসনটি দলকে উপহার দিতে চান তিনি। তিনি আরও বলেন, ক্ষমতার সমবণ্টন প্রয়োজন এবং এই মনোনয়নের মাধ্যমে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
মিরপুরের শাহ আলী ও দারুস সালাম এলাকা নিয়ে গঠিত এই আসনের প্রতিটি ভোটারের হয়ে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে মানুষের অধিকার আদায়ে মাঠে থাকার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন, জনগণের সেবায় জীবন উৎসর্গ করতেই তিনি রাজনীতিতে আছেন।
বিএনপির অনেক নারী প্রার্থীই রাজনীতিতে পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারক। ফারজানা শারমিন পুতুলের বাবা ফজলুর রহমান পটল এবং আফরোজা খান রিতার বাবা হারুনুর রশিদ খান মুন্নু ছিলেন সাবেক মন্ত্রী ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা। শামা ওয়াবেদ ইসলামের বাবা কেএম ওবায়দুর রহমান ছিলেন বিএনপির সাবেক মহাসচিব। সানজিদা ইসলাম তুলি গুম হওয়া বিএনপি নেতা সাজেদুল ইসলাম সুমনের বোন এবং ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক।
তাহসিনা রুশদীর লুনার স্বামী এম ইলিয়াস আলী ২০১২ সালে গুম হন। নায়াব ইউসুফের বাবা সাবেক মন্ত্রী চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ। মাদারীপুর-১ আসনের প্রার্থী নাদিরা মিঠু স্থানীয় রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় এবং আগে উপজেলা নির্বাচনেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। এনসিপির নারী প্রার্থীরাও নির্বাচনে চমক দেখাতে আশাবাদী। ইঞ্জিনিয়ার নাবিলা তাসনিদ বলেন, দেশের প্রতি ভালোবাসার কারণে বিদেশে যাওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি দেশেই থেকেছেন।
সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট তাকে রাজনীতিতে আসতে অনুপ্রাণিত করেছে। ডা. তাজনূভা জাবীন জানান, গণ-অভ্যুত্থানে তিনি সামনের সারিতে থেকে ভূমিকা রেখেছেন। সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো কেবল নারী নয়, সামগ্রিক রাজনীতির জন্য প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি। ডা. তাসনিম জারা জানান, তিনি নির্বাচনি প্রচারণায় আইনের বাইরে এক টাকাও ব্যয় করবেন না। অসততা ও মিথ্যার রাজনীতি পরিহার করার অঙ্গীকার করেন তিনি।
নাহিদা সারওয়ার নিভা বলেন, নতুন দল হিসেবে চ্যালেঞ্জ থাকলেও তারা মানুষের সেবক হতে চান, তথাকথিত জনপ্রতিনিধি নন।
বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ কেবল সংখ্যাগত পরিবর্তন নয়; এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরের ইঙ্গিত। ভোটারদের মধ্যেও নতুন নেতৃত্ব ও নতুন রাজনীতির প্রতি আগ্রহ বাড়ছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নারীর ক্ষমতায়ন, প্রতিনিধিত্ব ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে কতটা ভূমিকা রাখে—সেই দিকেই এখন সবার দৃষ্টি।