স্টাফ রিপোর্টার:
সরকার যখন বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ)কে দালালমুক্ত ও সম্পূর্ণ ডিজিটাল সেবার আওতায় আনতে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, তখন রাজধানীর মিরপুর বিআরটিএ অফিসে দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র। অনুসন্ধানে পাওয়া অভিযোগ অনুযায়ী, ওই অফিসে একটি সক্রিয় দালালচক্র দীর্ঘদিন ধরে ঘুষ বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে, যার পেছনে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা জাকারিয়ার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদদের অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে লাইসেন্স, যানবাহন রেজিস্ট্রেশন, ট্যাক্স টোকেন ও ফিটনেস সনদ নিতে আসা একাধিক সেবাগ্রহীতার সঙ্গে কথা বলা হয়। তারা অভিযোগ করেন, নির্ধারিত সরকারি ফি পরিশোধ করলেও নানা অজুহাতে তাদের কাজ আটকে রাখা হয়। পরে অফিস চত্বরে অবস্থানরত দালালদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বাধ্য করা হয়।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী, মিরাজ ও মফিজ নামের দুই দালাল নিয়মিত বিআরটিএ অফিস এলাকায় প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করেন এবং ‘কাজ নিশ্চিত’ করার আশ্বাস দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করেন। অনেক ক্ষেত্রে দালালরা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার নাম ব্যবহার করে টাকা দাবি করে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
রংপুর থেকে আসা এক সেবাগ্রহীতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমার নাম সোহেল। সরকারি ফি দেওয়ার পরও আমার কাছ থেকে অতিরিক্ত ১০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় বারবার বলা হয়—স্যার জাকারিয়া লাঞ্চে গেছেন, পরে আসবেন, হিসাব চলছে। এভাবে আমার কাজ আটকে রাখা হয়।”
আরেক সেবাগ্রহীতা অভিযোগ করে বলেন, “কাউন্টার থেকেই বলা হয় দালালের মাধ্যমে কথা বলতে। টাকা না দিলে ফাইল নড়ে না। এটা এখন ওপেন সিক্রেট।”
অভিযোগ অনুযায়ী, সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা জাকারিয়া দালালদের অবাধ চলাচলে কোনো বাধা দেন না। বরং নির্দিষ্ট দালালের মাধ্যমেই কাজ এগোচ্ছে—এমন ধারণা সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে অভিযুক্ত কর্মকর্তার বক্তব্য জানতে চেষ্টা করা হলে তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
সুশাসন বিশ্লেষকদের মতে, বিআরটিএর মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবা প্রতিষ্ঠানে দালালনির্ভরতা শুধু সাধারণ মানুষকে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে না, বরং সরকারি রাজস্ব ক্ষুণ্ন করে এবং সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।
অভিযোগ রয়েছে, মিরাজ ও মফিজ প্রকাশ্যেই বলেন—“জাকারিয়া স্যার দেখবেন।” এই নাম ব্যবহার করেই তারা দিনের পর দিন ঘুষ আদায় করছে বলে দাবি ভুক্তভোগীদের। প্রশ্ন উঠেছে, কীভাবে তারা নিয়মিত অফিসে অবস্থান করে? কার আশ্রয়ে তারা এত প্রভাবশালী?
ভুক্তভোগীরা এ ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এবং বিআরটিএ সদর দপ্তরের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, দালাল উচ্ছেদ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি উঠেছে।
বিআরটিএকে দালালমুক্ত করার ঘোষণা যদি বাস্তবে কার্যকর না হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরবে না—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।