সিন্ডিকেট ও দুর্নীতির অভিযোগ: মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দুই ভাইয়ের দাপট

নিজস্ব প্রতিবেদক:

রাজধানীর মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস দীর্ঘদিন ধরেই দুই ভাইয়ের নিয়ন্ত্রণে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আওলাদ হোসেন ও তার ছোট ভাই মো. আকিব হোসেন এক ধরনের সিন্ডিকেট পরিচালনা করছেন, যা জমি কেনাবেচার গুরুত্বপূর্ণ নথি ও সরকারি দলিল ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে। সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, গত এক দশক ধরে আওলাদ হোসেন নকলনবিস হিসেবে দায়িত্বে থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন অনিয়মে জড়িত। বিশেষ করে বালাম বই, যা জমি দলিলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নথি, তা ঠিকমতো পরিচালনা করেননি। নকলনবিসদের মধ্যে একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, “আওলাদ হোসেন বালাম বই ঘষামাজা করে বা ছিঁড়ে ফেলে নিজের সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। ফলে সেবা প্রত্যাশীরা চাপের মধ্যে পড়ে।”

অফিস সূত্র জানায়, আওলাদ হোসেন দলিল লেখকদের স্বাক্ষর নকল করে বিভিন্ন অফিসে দলিল রেজিস্ট্রি করেন এবং মোটা অংকের অর্থ হাতিয়ে নেন। আর তার ছোট ভাই আকিব হোসেনও কোনো বৈধ নিয়োগ ছাড়াই অফিসের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র নিয়ন্ত্রণ করছেন। এটি স্থানীয় আইন-শৃঙ্খলা ও সরকারি নিয়মের জন্য বিশেষভাবে চিন্তার বিষয়। অভিযোগ রয়েছে, দুই ভাই ছাড়াও এই সিন্ডিকেটে কিছু দলিল লেখক, স্ট্যাম্প ভেন্ডার ও চিহ্নিত দালাল জড়িত। তারা নিয়ম-নীতি তোয়াক্কা না করে জমি কেনাবেচা, দলিল নথি ঘষামাজা ও নকল স্বাক্ষর দিয়ে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন। এই প্রক্রিয়ায় বহু বছর ধরে সরকারি তদারকি ব্যর্থ হচ্ছে।

তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার একটি সূত্র জানায়, আওলাদ হোসেন আগে ইয়াবার ব্যবসায় জড়িত ছিলেন। এক সময়ে পাঁচ হাজার পিস ইয়াবাসহ গ্রেফতারও হয়েছেন। এছাড়া রাজনৈতিকভাবে তিনি আওয়ামী লীগের সঙ্গে মেলামেশা শুরু করেন এবং সাবেক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামালের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হয়ে যান। আসাদুজ্জামান কামালের নাম বিক্রি করে তিনি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দাপট দেখাতেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, তার অবৈধ অর্থ নিয়মিত রাজনৈতিক কাজে ব্যবহার হতো।

সম্পত্তি ও বিনিয়োগের বিষয় অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, আওলাদ হোসেন রাজধানীর তেজগাঁও কুনিপাড়ায় পাঁচতলা আলিশান বাড়ি, টঙ্গী, বাড্ডা ও হাতিরঝিলে বাবার জায়গায় নিজের অর্থায়নে বাড়ি ও জমি ক্রয় করেছেন। সিলেটের সুনামগঞ্জে তিন একরের বেশি জায়গায় তিনি কয়েক কোটি টাকা বিনিয়োগ করে একটি মাছের ঘেরও করেছেন। বিষয়টি জানতে চাইলে আওলাদ হোসেন জানান, এসব সম্পত্তি পৈতৃক এবং বিনিয়োগ তার নিজস্ব অর্থায়নে হয়েছে। ২০১২ সালে ইয়াবার মামলায় তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার পুলিশ তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডেকে তিন মাস কারাভোগ করতে হয়েছিল। যদিও পরে খালাস পান।

অভিযোগগুলো নিয়ে স্থানীয় জনগণ ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা বলেন, “দুই ভাইয়ের সিন্ডিকেটে শুধু ব্যক্তিগত মুনাফাই নয়, সরকারি দলিল ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলাও তৈরি হয়েছে। অফিসের নথিপত্রে যেভাবে হস্তক্ষেপ হচ্ছে, তা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও স্বার্থের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।” সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের একাধিক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, “বালাম বই ও অন্যান্য নথি ঘষামাজা ও নকল করার ফলে জমি কেনাবেচা ও আইনগত সুরক্ষা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ ধরনের সিন্ডিকেটের কারণে বহু মানুষ নিরপরাধে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।”

সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে এই অভিযোগ সম্বন্ধে জানতে চাইলে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বিষয়টি তদন্তের জন্য উচ্চ পর্যায়ে নথি প্রেরণ করা হয়েছে। এই ঘটনায় বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয় যে, দু’জন নকলনবিস শুধু অফিসের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনেই প্রভাব বিস্তার করেননি, বরং তাদের অবৈধ কর্মকাণ্ডে রাজনৈতিক সংযোগ ও অর্থনৈতিক লেনদেনও জড়িত। ফলে বিষয়টি শুধু মোহাম্মদপুরে নয়, দেশের অন্যান্য সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের জন্যও সতর্কবার্তা হিসেবে গণ্য হচ্ছে।

স্থানীয়রা দাবি করেন, “দুই ভাইয়ের সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়ার মাধ্যমে অফিসের স্বচ্ছতা ও সাধারণ জনগণের স্বার্থ রক্ষা করতে হবে। না হলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের অনিয়ম ও আর্থিক ক্ষতি হতে পারে।” এ ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসন ও সবার সহযোগিতায় কার্যকর তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে সরকারের দলিল ও সম্পত্তি সংক্রান্ত সেবার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *