মোঃ আনজার শাহ:
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের বহুল আলোচিত প্লট ও ফ্ল্যাট বরাদ্দ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, “যেখানে দুর্নীতি আছে সেখানে আমি নেই।” এই অবস্থান থেকেই প্লট–ফ্ল্যাট বরাদ্দের ক্ষেত্রে মন্ত্রীর সরাসরি ক্ষমতা তুলে দেওয়া হয়েছে। এখন থেকে বরাদ্দ হবে উন্মুক্ত লটারির মাধ্যমে।
সম্প্রতি সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে আমাদের সময়–এর সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় মন্ত্রী বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি দ্রুত বুঝতে পেরেছেন যে এই মন্ত্রণালয়ে যত অভিযোগ ও বিতর্ক রয়েছে, তার বড় অংশই প্লট ও ফ্ল্যাট বরাদ্দকে ঘিরে। তাই এই খাতে ব্যক্তিগত সম্পৃক্ততা না রেখে পুরো প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও নিয়মভিত্তিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে কুমিল্লা–৮ আসন থেকে বিপুল ভোটে বিজয়ী হন জাকারিয়া তাহের। পরে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর তাঁর মন্ত্রিসভায় গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রীর দায়িত্ব পান তিনি। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই মন্ত্রণালয়ের নানা অনিয়ম ও দীর্ঘদিনের অভিযোগ দূর করার উদ্যোগ শুরু করেন।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), গণপূর্ত অধিদপ্তর এবং জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্লট ও ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই এই বরাদ্দকে ঘিরে অনিয়ম, তদবির ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, মানুষের কাছ থেকে তিনি এসব অভিযোগ শুনেছেন এবং বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন। তাঁর ভাষায়, “দুর্নীতি হয় কোথায়? অনিয়মের অভিযোগগুলো দেখলে বোঝা যায়, অধিকাংশই প্লট ও ফ্ল্যাট বরাদ্দকে কেন্দ্র করে।”
তিনি জানান, সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকেও এ বিষয়ে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী আগেই ঘোষণা দিয়েছেন, সংসদ সদস্য বা মন্ত্রীরা কেউই প্লট বা ফ্ল্যাট নেবেন না। এই ঘোষণার পর থেকেই তদবির অনেকটা কমে গেছে এবং অনিয়মের প্রবণতাও কমেছে বলে মনে করছেন তিনি।
জাকারিয়া তাহের বলেন, “আগে মন্ত্রীর হাতে প্লট–ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়ার ক্ষমতা ছিল। চাইলে তিনি যে কাউকে বরাদ্দ দিতে পারতেন। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই ক্ষমতা তুলে দিয়েছি। এখন কোনো প্লট বা ফ্ল্যাট বরাদ্দের এখতিয়ার মন্ত্রীর হাতে নেই।”
প্লট–ফ্ল্যাট বরাদ্দের ক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তা, চিকিৎসক, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশাজীবীর জন্য যে কোটা পদ্ধতি রয়েছে, তা বহাল থাকবে বলেও জানান মন্ত্রী। তবে সেই বরাদ্দ প্রক্রিয়ায় মন্ত্রীর কোনো ভূমিকা থাকবে না।
তিনি বলেন, “আইনে যেভাবে কোটা নির্ধারিত আছে, সেভাবেই থাকবে। কিন্তু মন্ত্রী হিসেবে সেখানে আমার কিছু করার সুযোগ নেই। বরাদ্দের পুরো প্রক্রিয়াটিই নিয়ম অনুযায়ী চলবে।”
নতুন ব্যবস্থায় কীভাবে বরাদ্দ দেওয়া হবে—এ প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, এখন থেকে উন্মুক্ত লটারির মাধ্যমে প্লট ও ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া হবে। এতে আবেদনকারীদের মধ্যে সমান সুযোগ তৈরি হবে এবং প্রভাব খাটানোর সুযোগ থাকবে না।
অতীতে লটারির মাধ্যমেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে—এ প্রসঙ্গ তুললে মন্ত্রী কিছুটা বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, বিষয়টি তিনি খতিয়ে দেখবেন। তাঁর মতে, পুরো প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর করা গেলে এমন অভিযোগের সুযোগও কমে যাবে।
দায়িত্ব নেওয়ার পর মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন দপ্তরে কাজের গতি ফিরেছে বলেও দাবি করেন জাকারিয়া তাহের। তিনি জানান, রাজউক, গণপূর্ত অধিদপ্তর ও জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষসহ সব সংস্থায় জনভোগান্তি কমাতে এবং প্রশাসনিক জটিলতা দূর করতে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, “মানুষ যেন এই মন্ত্রণালয়ে এসে ভোগান্তির শিকার না হন, সেটাই আমার প্রধান লক্ষ্য। আমরা চাই মন্ত্রণালয়টিকে সত্যিকার অর্থে জনবান্ধব প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে।”
তিনি আরও বলেন, স্বল্প সময়ের মধ্যেই বিভিন্ন দপ্তরে কাজের গতি বাড়াতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে সময়ক্ষেপণ কমানো, ফাইল নিষ্পত্তিতে দ্রুততা আনা এবং সেবাগ্রহীতাদের জন্য প্রক্রিয়া সহজ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
গৃহায়ন খাতের এই সংস্কার উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে প্লট ও ফ্ল্যাট বরাদ্দকে ঘিরে দীর্ঘদিনের বিতর্ক অনেকটাই কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপনের সুযোগ তৈরি হবে বলেও আশা প্রকাশ করা হচ্ছে।