মোঃ সোহেল:
চট্টগ্রাম মহানগরীর কোতোয়ালি থানার সিআরবি পুলিশ ফাঁড়ির আওতাধীন এলাকায় পবিত্র রমজান মাসে দিনের বেলায় খাবারের দোকান খোলা রাখতে প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা করে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। অন্তত ২৫০ থেকে ৩০০টি দোকান থেকে নিয়মিত এই টাকা তোলা হচ্ছে বলে দাবি করেছেন একাধিক ব্যবসায়ী। অভিযুক্ত হিসেবে আবদুল রশিদ নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, যিনি নিজেকে পুলিশ ফাঁড়ির ‘লাইনম্যান’ পরিচয় দেন বলে জানিয়েছেন দোকানদাররা।
ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা আদায়ের অভিযোগ
এলাকার কয়েকজন হোটেল ও রেস্তোরাঁ মালিক জানান, রমজান মাসে দিনের বেলায় দোকান খোলা রাখলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি বাড়ে—এমন আশঙ্কা দেখিয়ে তাঁদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক দোকানদার বলেন,
“রমজান শুরু হলেই রশিদ এসে বলে, দোকান খোলা রাখতে হলে প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা দিতে হবে। না দিলে ঝামেলা হবে। আমরা ছোট ব্যবসায়ী, ভয় পেয়ে টাকা দিই।”
আরেক ব্যবসায়ী অভিযোগ করে বলেন,
“শুধু রমজান না, সারা বছরই প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৫০ টাকা করে দিতে হয়। না দিলে ফুটপাত দখল বা অন্য অজুহাতে হয়রানি করা হয়।”
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, টাকা নেওয়ার সময় কোনো রসিদ দেওয়া হয় না। সব লেনদেন নগদে এবং গোপনে সম্পন্ন হয়।
প্রতিদিন লাখ টাকার লেনদেন?
দোকানদারদের হিসাব অনুযায়ী, যদি ২৫০ থেকে ৩০০টি দোকান থেকে রমজান মাসে প্রতিদিন গড়ে ৩৫০ টাকা করে আদায় করা হয়, তাহলে দৈনিক আদায়ের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৮৭ হাজার ৫০০ থেকে ১ লাখ ৫ হাজার টাকা। মাসব্যাপী এই অঙ্ক কয়েক কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করছেন তাঁরা। তবে এই হিসাবের কোনো স্বাধীন যাচাই পাওয়া যায়নি।
‘পুলিশের হয়ে টাকা তুলি’—এমন দাবি
অভিযোগ অনুযায়ী, আবদুল রশিদ নিজেকে সিআরবি পুলিশ ফাঁড়ির ‘লাইনম্যান’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে দাবি করেন, তিনি পুলিশের হয়ে টাকা সংগ্রহ করেন। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েও তিনি একইভাবে চাঁদা আদায় করতেন এবং এখনো তা অব্যাহত রেখেছেন।
তবে অভিযুক্ত আবদুল রশিদের বক্তব্য জানতে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
পুলিশের বক্তব্য: অভিযোগ পেলে তদন্ত
এ বিষয়ে সিআরবি পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“পুলিশের পক্ষ থেকে কাউকে চাঁদা তোলার দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। কেউ যদি পুলিশের নাম ভাঙিয়ে টাকা তোলে, সেটি সম্পূর্ণ অবৈধ। লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
কোতোয়ালি থানার এক কর্মকর্তা জানান, রমজান মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে টহল জোরদার করা হয়। তবে দোকান খোলা রাখার বিনিময়ে অর্থ আদায়ের কোনো প্রশ্নই আসে না। তিনি ব্যবসায়ীদের নির্ভয়ে অভিযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান।
ব্যবসায়ী সমিতির উদ্বেগ
স্থানীয় ব্যবসায়ী সমিতির এক নেতা বলেন,
“ব্যবসায়ীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা আদায় গুরুতর অপরাধ। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হবে।”
এলাকার কয়েকজন বাসিন্দাও জানান, দীর্ঘদিন ধরে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ শোনা গেলেও ভয়ে কেউ প্রকাশ্যে মুখ খুলতে চান না।
প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা
ব্যবসায়ীরা বলছেন, নিরাপদে ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ নিশ্চিত না হলে চাঁদাবাজির মতো ঘটনা বন্ধ হবে না। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ প্রত্যাশা করছেন তাঁরা।
এখন দেখার বিষয়—পুলিশের নাম ভাঙিয়ে চাঁদা আদায়ের এই অভিযোগের তদন্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কত দ্রুত এবং কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়।