ঢাকা শহরকে একটি বাসযোগ্য নগরীতে পরিণত করার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত রাজউক (ঢাকা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ) স্বাধীনতার পর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে একের পর এক বিতর্ক ও অনিয়মের জন্য আলোচনার কেন্দ্রে আছে। প্রতিষ্ঠানটির পূর্বসূরি ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (ডিআইটি) থেকে শুরু করে রাজউক পর্যন্ত, বহু বছর ধরে দুর্নীতি জেঁকে বসেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), গৃহায়ন মন্ত্রণালয় এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট বিভাগ বিভিন্ন অভিযান পরিচালনা করলেও দুর্নীতির চক্র রোধ করতে পারছে না প্রতিষ্ঠানটি।
দুর্নীতি দমন কমিশন কয়েকজন কর্মকর্তাকে ধরে মামলা দিলেও, অধিকাংশ সময় আইনের ফাঁকফোকর এবং টাকার বিনিময়ে তারা রফা হয়ে বের হয়ে যায়। এর ফলে রাজউকের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও বাস্তবে শাস্তির প্রভাব খুবই সীমিত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন পরিস্থিতি নগরীর নিরাপত্তা ও বাসযোগ্যতার জন্য মারাত্মক হুমকি।
রাজউকের নকশা অনুমোদন ও জমি ছাড়পত্রের ক্ষেত্রে ঘুষের প্রথা এখন সাধারণ নীতি হয়ে উঠেছে। নতুন কোনো ভবন নির্মাণের আগে অনুমোদন পাওয়ার নির্ধারিত সময়কালে তা সম্ভব হয় না, যতক্ষণ না সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ঘুষ প্রদান করে। খোদ রাজউকের কর্মকর্তাদের মধ্যে এই প্রথা সম্পর্কে মন্তব্য পাওয়া গেছে।
নকশা ভঙ্গ করে নির্মাণাধীন ভবনের বিষয়ে অসংখ্য অভিযোগ জমা পড়লেও ভুক্তভোগীরা প্রতিকার পান না। ইমারত পরিদর্শকের সাথে রফার মাধ্যমে নকশা ভঙ্গকারীরা নিয়মিত রক্ষা পাচ্ছে। অভিযোগের পরও প্রকৃত তদন্ত হওয়া না এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া না হওয়ায়, রাজউকের দুর্নীতি চক্র অব্যাহত রয়েছে।
ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় এমন নকশা ভঙ্গ করে নির্মিত ভবনের সংখ্যা হাজারেরও বেশি। পাঁচ তলা অনুমোদিত ভবন ছয় থেকে সাত তলা পর্যন্ত নির্মাণ করা হলেও অনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে তা রক্ষা পাচ্ছে। এই অনিয়ম শুধু আইন ভঙ্গ নয়, বরং রাজধানীকে ভূমিকম্প ঝুঁকিতে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প হলেও রাজধানীর বহু ভবন ধ্বসে পড়বে এবং উদ্ধার কাজ করা প্রায় অসম্ভব হবে।
রাজউকের বর্তমান চেয়ারম্যান রিয়াজুল ইসলাম দায়িত্ব নেওয়ার পরও সমস্যা সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি। জোন ৭-এ অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। এই জোনের দায়িত্বে থাকা ইমারত পরিদর্শক মোঃ মাসুদ রানা অভিযোগের বাইরে সব ভবন থেকে ঘুষ নেন। জানা গেছে, মোঃ মাসুদ রানা টাকা ছাড়া কোনো কিছুই বোঝেন না এবং তার দায়িত্বে থাকা প্রতিটি ভবনে নকশা ভঙ্গের ঘটনা স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে চলে।
এভাবে রাজউকের নকশা ভঙ্গ ও অনিয়ম রাজধানীকে শুধু অনিয়মের জঞ্জালেই আবদ্ধ রাখছে না, বরং নাগরিকদের জীবন ও সম্পত্তি বিপন্ন করছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়া হলে ঢাকা শহরের ভবিষ্যত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, সরকারের উচিত কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া, ঘুষ-দূর্বৃত্তি রোধ করা এবং নগরীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
রাজউকের দুর্নীতি রোধ করা না গেলে ঢাকা শহর এক সময় মহাবিপদের মুখোমুখি হবে।