মোহাম্মদ হোসেন হ্যাপী:
নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী লাঙ্গলবন্দে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় আয়োজন পুণ্য স্নানোৎসব যথাযথ ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসবমুখর পরিবেশে শুরু হয়েছে। চৈত্র মাসের শুক্লা অষ্টমী তিথিকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এই মহাস্নানে অংশ নিতে দেশ-বিদেশের লাখো পুণ্যার্থী ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে সমবেত হয়েছেন। ভোর থেকে শুরু করে দিনব্যাপী নদীর ঘাটগুলোতে ভক্তদের ঢল নামে। তাদের বিশ্বাস, এই পবিত্র তিথিতে ব্রহ্মপুত্র নদের জলে স্নান করলে পাপমোচন হয় এবং সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার আশীর্বাদ লাভ করা যায়।
উৎসব উপলক্ষে পুরো লাঙ্গলবন্দ এলাকা জুড়ে নেওয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও ব্যাপক প্রস্তুতি। স্নানোৎসবের সার্বিক পরিস্থিতি পরিদর্শনে উপস্থিত ছিলেন নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোঃ রায়হান কবির। এ সময় তাঁর সঙ্গে জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। পরিদর্শন শেষে জেলা প্রশাসক বলেন, পুণ্যার্থীদের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ঈদের সময় হওয়ায় মহাসড়কে যানবাহনের চাপ বাড়তে পারে, তাই ট্রাফিক বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, স্নানোৎসবকে কেন্দ্র করে চুরি, ছিনতাইসহ যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা প্রতিরোধে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে দুটি ওয়াচ টাওয়ার স্থাপন করা হয়েছে এবং জেলা প্রশাসনের একজন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছেন। প্রয়োজনে সেনাবাহিনীর টহলও মোতায়েন থাকবে বলে তিনি জানান। পাশাপাশি পূজা উদযাপন পরিষদের স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে বিএনপির প্রায় ২৫০ জন স্বেচ্ছাসেবক পুণ্যার্থীদের সেবায় নিয়োজিত রয়েছেন।
স্বাস্থ্যসেবার দিক থেকেও নেওয়া হয়েছে বিশেষ উদ্যোগ। ১০ শয্যার একটি অস্থায়ী হাসপাতাল স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে সার্বক্ষণিক মেডিকেল টিম প্রস্তুত রয়েছে। জরুরি রোগী পরিবহনের জন্য রাখা হয়েছে ছয়টি অ্যাম্বুলেন্স এবং স্থানীয়ভাবে চলাচলের জন্য রিকশা সুবিধাও নিশ্চিত করা হয়েছে। পুণ্যার্থীদের সুবিধার্থে ২৪টি স্নানঘাট সংস্কার করা হয়েছে এবং নদীর কচুরিপানা অপসারণ করা হয়েছে। বিশুদ্ধ পানির জন্য স্থাপন করা হয়েছে ৪৭টি নলকূপ। নারীদের জন্য পৃথক পোশাক পরিবর্তন কক্ষ নির্মাণের পাশাপাশি ২০০টি অস্থায়ী শৌচাগারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার মোঃ মিজানুর রহমান মুন্সি জানান, পুণ্যার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে দুই শিফটে প্রায় ১১০০ পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় নেওয়া হয়েছে বিশেষ উদ্যোগ। আনসার সদস্যরা পুলিশকে সহযোগিতা করছেন এবং নৌপুলিশও মোতায়েন রয়েছে যাতে নদীপথে কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে। পুরো তিন কিলোমিটার এলাকা সিসিটিভির আওতায় আনা হয়েছে এবং সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। ওয়াচ টাওয়ারের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
লাঙ্গলবন্দ স্নান উৎসব উদযাপন কমিটির উপদেষ্টা শংকর কুমার দে জানান, বুধবার বিকেল ৫টা ১৭ মিনিটে আনুষ্ঠানিকভাবে স্নান শুরু হয়েছে, যা বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) দুপুর ২টা ৫৯ মিনিট পর্যন্ত চলবে। এবারের স্নানোৎসবে লাঙ্গলবন্দের ২৪টি ঘাটে একযোগে স্নান কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
পৌরাণিক কাহিনি অনুযায়ী, ত্রেতা যুগে ঋষি জমদগ্নি ও রেণুকার পুত্র পরশুরাম মাতৃহত্যার পাপ থেকে মুক্তি পেতে কঠোর তপস্যা করেন। পরবর্তীতে দেব নির্দেশনা অনুযায়ী চৈত্র মাসের অষ্টমী তিথিতে এক পবিত্র নদীতে স্নান করে তিনি পাপমুক্ত হন। সেই পবিত্র জলধারা মানুষের কল্যাণে পৌঁছে দিতে তিনি লাঙ্গল দিয়ে হিমালয় থেকে সমভূমিতে জলপ্রবাহ আনেন। বর্তমান নারায়ণগঞ্জের বন্দর এলাকায় এসে তিনি লাঙ্গল চালানো বন্ধ করলে স্থানটির নাম হয় ‘লাঙ্গলবন্দ’।
সব মিলিয়ে, প্রশাসনের কঠোর নিরাপত্তা ও সুপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে এবারের লাঙ্গলবন্দ পুণ্য স্নানোৎসব শান্তিপূর্ণ, সুশৃঙ্খল ও উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হবে বলে সংশ্লিষ্টদের আশা।