কামরুল ইসলাম:
চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলার লোহাগাড়া উপজেলার আমিরাবাদ, চরম্বা, কলাউজান ও পদুয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়, ফসলি জমির টপ সয়েল কাটা এবং সেলো মেশিন বসিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের মহোৎসব চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে জড়িত রয়েছে একটি সংঘবদ্ধ বালু ও মাটিখেকো চক্র।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী একটি সিন্ডিকেট দিবারাত্রি সেলো মেশিন, ড্রেজার ও এক্সকাভেটর ব্যবহার করে ছড়া, খাল, পাহাড় ও কৃষিজমি থেকে অবৈধভাবে বালু ও মাটি উত্তোলন করছে। এসব বালু ট্রাকযোগে বিভিন্ন এলাকায় পাচার করা হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় বিএনপি নেতারা ও স্থানীয় সংসদ সদস্য প্রতিবাদ জানালেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। যদিও মাঝে মাঝে অভিযান পরিচালনা করা হয়, তবে তা স্থায়ী সমাধান আনতে ব্যর্থ হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, আমিরাবাদ, চরম্বা, কলাউজান ও পদুয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে ছড়াখালের তলদেশ অস্বাভাবিকভাবে গভীর করে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও ৫০-৬০ ফুট প্রশস্ত প্রাকৃতিক ছড়াখাল ২০০ ফুট পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে পড়েছে। এতে কৃষিজমি ধ্বংস হয়ে পুকুরে পরিণত হচ্ছে এবং কৃষকরা জমি হারিয়ে জীবিকা সংকটে পড়ছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মোর্শেদ আলম মানিক, মো. এমরান ও মাওলানা শহিদুল ইসলামসহ কয়েকজনের নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট এই কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তারা ফসলি জমি, পাহাড় ও খাল থেকে মাটি ও বালু উত্তোলন করে বিক্রি করছে। এর ফলে গ্রামীণ সড়কগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং ধুলাবালিতে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে উঠছে।
এছাড়া, কেউ এই অবৈধ কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করলে তাকে হুমকি-ধমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। গত ২২ মার্চ রাতে পুটিবিলা পাহাড়চান্দা এলাকায় অবৈধ বালু উত্তোলনের চিত্র ধারণ করতে গেলে তিনজন সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, স্থানীয় চিহ্নিত সন্ত্রাসী ওসমান ও শফির নেতৃত্বে এ হামলা চালানো হয় এবং তাদের প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে।
পরিবেশ আইন অনুযায়ী, ছড়া ও খাল থেকে ভারী যন্ত্র ব্যবহার করে বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তবুও ইজারা শর্ত ভেঙে নির্ধারিত সীমার বাইরে গিয়ে নির্বিচারে বালু উত্তোলন অব্যাহত রয়েছে।
লোহাগাড়া উপজেলা ভূমি অফিস সূত্র জানায়, বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও সহকারী কমিশনার (ভূমি)কে অবহিত করা হয়েছে। এ বিষয়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও ভারপ্রাপ্ত ইউএনও জানান, অবৈধ বালু ও মাটি উত্তোলনের বিষয়টি প্রশাসনের নজরে রয়েছে এবং ইতোমধ্যে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলে তদন্ত সাপেক্ষে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, বিচ্ছিন্ন অভিযানে কোনো স্থায়ী সমাধান আসছে না। তারা বলছেন, সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ও ধারাবাহিক ব্যবস্থা না নিলে আমিরাবাদ, চরম্বা, কলাউজান ও পদুয়ার পাহাড়, কৃষিজমি ও ছড়াখাল পুরোপুরি ধ্বংসের মুখে পড়বে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এভাবে বালু উত্তোলনের ফলে ছড়াখালের গভীরতা ও প্রশস্ততা বেড়ে গেলে বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঢলে ভয়াবহ বন্যা ও ভাঙনের ঝুঁকি বাড়বে। পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।