লোহাগাড়ায় ‘চোর–পুলিশ’ খেলা: একদিকে লোক দেখানো অভিযান, অন্যদিকে বালু-মাটি লুটের মহোৎসব

কামরুল ইসলাম:

চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলায় প্রশাসনের কথিত অভিযান চললেও বাস্তবে থামছে না বালু ও মাটি লুটের ভয়াবহ তৎপরতা। একদিকে লোক দেখানো অভিযান, অন্যদিকে সংগঠিত চক্রের দৌরাত্ম্যে দিন-রাত অব্যাহত রয়েছে অবৈধভাবে বালু ও মাটি উত্তোলন। স্থানীয়দের ভাষায়, পুরো বিষয়টি এখন যেন “চোর–পুলিশ খেলা”-য় পরিণত হয়েছে।

উপজেলার আমিরাবাদ, চরম্বা, কলাউজান ও পদুয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকা, ফসলি জমি এবং টংকবতী, ডলু খালসহ ছোট-বড় বিভিন্ন খাল থেকে অবাধে বালু ও মাটি উত্তোলন চলছে। অভিযোগ রয়েছে, কোনো প্রকার বৈধ ইজারা ছাড়াই শ্যালো মেশিন ও এক্সকাভেটর ব্যবহার করে প্রভাবশালী চক্র এসব কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দিনে-রাতে সমান তালে চলছে এই অবৈধ কর্মকাণ্ড। এ কাজে সরকারি ও বিরোধী দলের কিছু স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা ও তাদের অনুসারীরা জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। যেসব সড়ক ব্যবহার করে মাটি ও বালু পরিবহন করা হয়, সেসব জায়গায় নজরদারির জন্য বসানো থাকে ‘লোক’। প্রশাসনের গাড়ি বা কোনো অভিযান পরিচালনার আভাস পেলেই মুহূর্তের মধ্যে খবর পৌঁছে যায় সংশ্লিষ্টদের কাছে। ফলে অভিযান পরিচালনার আগেই ঘটনাস্থল ফাঁকা হয়ে যায়, আর কিছুক্ষণ পরই অন্য স্থানে আবার শুরু হয় একই কর্মকাণ্ড।

স্থানীয়ভাবে ‘মাটি খেকো’ হিসেবে পরিচিত কয়েকজনের নামও উঠে এসেছে অভিযোগে। তাদের মধ্যে রয়েছেন—দেলোয়ার, শাহাবুদ্দিন, মমতাজ, আজম, এরশাদ, জাহেদ, গফুর, দিদার, নাজিম, বেলাল, মহিউদ্দিন, সোহেল ও মোজাফফরসহ আরও অনেকে। অভিযোগ অনুযায়ী, এদের মধ্যে একটি গ্রুপ মাটি কাটার দায়িত্বে থাকলেও অন্য একটি গ্রুপ বাজারজাতকরণ ও বিক্রয়ের দায়িত্ব পালন করে থাকে।

বিশেষ করে চরম্বা ও কলাউজান এলাকার পাহাড়ি বনাঞ্চল থেকে নির্বিচারে মাটি কেটে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এতে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে এবং ঝুঁকির মুখে পড়ছে জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় বসতি। একই সঙ্গে ফসলি জমি নষ্ট হওয়ায় কৃষকরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

এলাকার সচেতন মহল বলছেন, বারবার প্রশাসনের কাছে অভিযোগ জানানো হলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। গণমাধ্যমে একাধিকবার সংবাদ প্রকাশিত হলেও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যত নীরব ভূমিকা পালন করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, তারা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছেন। ইউএনও ও এসিল্যান্ড জানিয়েছেন, কোথাও মাটি কাটা বা বালু উত্তোলনের খবর পেলেই তারা দ্রুত অভিযান চালান এবং অপরাধীদের ধরতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন। কিন্তু অভিযানের সময় গোপন তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে অভিযুক্তরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হচ্ছে।

এদিকে আরও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে—প্রশাসনের ভেতরের কিছু অসাধু ব্যক্তি, বিশেষ করে গাড়িচালকের মাধ্যমে অভিযানের আগেই তথ্য পাচার করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে এই তথ্য পাচার করা হয়, যার ফলে অপরাধীরা আগেভাগেই সরে পড়ে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, “পরিবেশ রক্ষা ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নে আমরা আপসহীন। তবে এ ক্ষেত্রে স্থানীয়দের সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি।”

স্থানীয় সচেতন মহলের প্রশ্ন—যদি প্রশাসন সত্যিই কঠোর হয়, তাহলে কেন দিনের পর দিন এমন প্রকাশ্য লুটপাট চলতে পারে? তারা দ্রুত কার্যকর ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *