শান্তিপূর্ণ নির্বাচনে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান ডক্টর হেলালের

মোঃ আনজার শাহ:

দৈনিক স্বাধীন সংবাদের সাংবাদিক মোহাম্মদ আনজার শাহকে দেওয়া এক একচেটিয়া সাক্ষাৎকারে বরুড়ার নির্বাচনী প্রার্থী ডক্টর অধ্যক্ষ শফিকুল আলম হেলাল ৫ই আগস্টের স্বাধীনতার চেতনাকে ধারণ করে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন ও পারস্পরিক সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছেন।

৫ই আগস্টের চেতনায় শান্তিপূর্ণ রাজনীতি: সাক্ষাৎকারে ডক্টর হেলাল বরুড়াবাসীর উদ্দেশে বলেন, “আমরা সকলেই শান্তিপ্রিয় মানুষ। শান্তিপ্রিয় মানুষের দায়িত্ব হলো একে অপরকে সহযোগিতা করা। ৫ই আগস্ট দেশ স্বাধীন হয়েছে, আমাদের উচিত সকলকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ করে দেওয়া।” তিনি জোর দিয়ে বলেন, সকল রাজনীতিবিদের উচিত ৫ই আগস্টকে স্মরণে রেখে কাজ করা এবং পরস্পরকে কলঙ্কিত না করে স্বচ্ছভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা।

“আমরা যদি কাউকে হুমকি-ধমকি দিই, তাহলে মনে করতে হবে আমরা আবার ফ্যাসিবাদের কাতারে শামিল হয়ে গেছি,” সতর্ক করে বলেন এই শিক্ষাবিদ। তিনি বলেন, পূর্বসূরিরা শান্তিপ্রিয় ছিলেন, সেই শান্তিকে অবশ্যই ধরে রাখতে হবে। কারও ওপর মানসিক বা শারীরিকভাবে আঘাত না হেনে মানবসেবা ও মানবকল্যাণে নিবেদিত থাকতে হবে। রাজনীতিকে তিনি ‘উন্নত মানের বিষয়’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, যারা রাজনীতি করেন তাদের মধ্যে উন্নতমানের চিন্তাভাবনা থাকা আবশ্যক।

৫৩ বছরের অবহেলায় পিছিয়ে পড়া বরুড়া: নির্বাচনী প্রচারণায় ইউনিয়ন-ওয়ার্ড এবং গ্রামে-গঞ্জে কাজ করার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ডক্টর হেলাল বলেন, গত ৫৩ বছরে বরুড়ার চিকিৎসা, শিক্ষা ও রাস্তাঘাটের ক্ষেত্রে যথাযথ মনোযোগ দেওয়া হয়নি। তিনি অভিযোগ করেন, “বরুড়া অন্যান্য উপজেলার চেয়েও সবচেয়ে বেশি অবহেলিত এবং যাতায়াতের রাস্তাগুলো অনুপযুক্ত অবস্থায় রয়েছে।”

“বরুড়াকে উন্নত করতে হলে সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব প্রয়োজন। এটি ছাড়া উন্নয়ন কোনোভাবেই সম্ভব নয়,” দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন তিনি। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন যে, সরকারি বরাদ্দ সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে বরুড়ার উন্নয়নে ভূমিকা রাখবেন।

শিক্ষক হিসেবে জনসেবার অঙ্গীকার: নিজের পরিচয় তুলে ধরে ডক্টর হেলাল বলেন, “আমি একজন শিক্ষক, একজন শিক্ষাবিদ, মানুষ গড়ার কারিগর। আমি সর্বদা বরুড়ার মানুষের পাশে থাকব এবং গরিব-অসহায় সকল মানুষের সমস্যা সমাধানে সচেষ্ট থাকব।” তিনি বলেন, এই প্রত্যয় নিয়ে বরুড়ার মানুষের সঙ্গে একাকার হয়ে থাকতে চান।

ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সহিষ্ণুতার বার্তা: ধর্মীয় সহিষ্ণুতার বিষয়ে ডক্টর হেলাল বলেন, “আমরা ধর্মপ্রিয় মানুষ। যারা মুসলিম তারা ইসলাম পালনে আন্তরিক, আর যারা অন্যান্য ধর্মাবলম্বী তারা নিজ নিজ ধর্ম পালনে নিষ্ঠাবান। সুতরাং ধর্মপ্রাণ মানুষ কখনও একে অপরের ক্ষতি করতে পারে না।”

তিনি সবাইকে সজাগ থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “আমরা বাংলার মানুষ, কেউ কারও ক্ষতি করব না, কেউ কারও প্রতি জুলুম-অত্যাচার করব না—এই প্রত্যয় নিয়ে রাজনীতি করতে হবে।”

প্রতিদ্বন্দ্বীদের প্রতি শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের আহ্বান: নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বীদের উদ্দেশে ডক্টর হেলাল বলেন, “বরুড়াকে শান্তিপূর্ণ রাখুন, নির্বাচন যেন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়, তবেই হবে স্বাধীনতার প্রকৃত ফলাফল।” তিনি বলেন, দেশকে আর বিদেশিদের অধীনতায় রাখতে চান না, বরং স্বাধীনভাবে নিজেদের পায়ে দাঁড়িয়ে যোগ্যতা অর্জন করে দেশকে উন্নত ও সুরক্ষিত করতে চান। “আল্লাহ তায়ালা আমাদের তাওফিক দান করুন,” বলে তিনি দোয়া করেন।

ওসমান হাদীর ওপর হামলার তীব্র নিন্দা: ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ওসমান হাদীর ওপর গুলিবর্ষণের ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে ডক্টর হেলাল বলেন, “ওসমান হাদীর ওপর যে আক্রমণ হয়েছে তা অত্যন্ত লজ্জাজনক। এ অবস্থায় থাকলে দেশ কখনও শান্তি পাবে না।”
তিনি ঘটনার তদন্ত করে দোষীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান এবং ওসমান হাদীর দ্রুত আরোগ্য কামনা করে বলেন, “আল্লাহ যেন ওসমান হাদীকে অতি দ্রুত পূর্ণ সুস্থতা দান করে আমাদের মাঝে ফিরিয়ে দেন।”

পিএইচডি ডিগ্রি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য: সাংবাদিক মোহাম্মদ আনজার শাহর প্রশ্নের জবাবে ডক্টর হেলাল তার পিএইচডি ডিগ্রি সম্পর্কে বিশদ তথ্য প্রদান করেন। তিনি জানান, ২০২০ সালে মালয়েশিয়ার বাইনারি ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে চার বছরে পিএইচডি সম্পন্ন করেছেন।
“প্রতি বছর পিএইচডি ডিগ্রির জন্য আমি মালয়েশিয়ায় এক মাস অবস্থান করতাম। বাকি সময় দেশে এসে থিসিসের কাজে মনোনিবেশ করতাম,” বলেন তিনি। তিনি জানান, এভাবে চার বছরে চারটি পরীক্ষা দিয়ে পিএইচডি সম্পন্ন করেছেন।

তার গবেষণার বিষয় ছিল ‘কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে মাধ্যমিক স্তরের একাডেমিক পারফরম্যান্সে প্রভাব বিস্তারকারী বিষয়সমূহের বিশ্লেষণ’। তিনি জানান, থিসিসের কাজে ৪৮টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হয়েছে।
ডক্টর হেলাল বলেন, তার সর্বশেষ পরীক্ষা ২৬শে মে অনুষ্ঠিত হয় এবং ২৭শে নভেম্বর ফলাফল প্রকাশিত হয়। “আমাকে চিঠিতে জানানো হয় যে আমি গৃহীত হয়েছি এবং পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছি। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমাকে অভিনন্দন জানানো হয়,” বলেন তিনি।

কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা সম্পর্কে: কওমি মাদ্রাসায় পড়াশোনা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ডক্টর হেলাল বলেন, তিনি বরুড়া মাদ্রাসায় তিন বছর পড়াশোনা করেছেন। এক বছর প্রাইভেট পড়াশোনা করার পর উলায় ভর্তি হন এবং দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করেন।

“আমার কাছে বরুড়া মাদ্রাসার প্রত্যয়নপত্র রয়েছে যা প্রমাণ করে আমি সেখানকার ছাত্র ছিলাম। সেখানকার আমার শিক্ষকদের সকলের নাম আমি জানি এবং আমার সহপাঠীদের সকলের নামও জানি,” বলেন তিনি।

ডক্টর হেলাল তার শিক্ষকদের স্মরণ করে বলেন, “আমার শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন মাওলানা আশরাফউদ্দিন হুজুর যিনি সেখানকার সদর ছিলেন, মাওলানা তাজুল ইসলাম যিনি মহিষখোলা হুজুর নামে পরিচিত, নুরুন্নবী হুজুর, মাওলানা কুদ্দুস সাহেব এবং ডেমরার হুজুর মাওলানা মুবিন সাহেব।”

তিনি জানান, এসব শিক্ষকদের কাছে দাওরায়ে হাদিস ও সিহাহ সিত্তাহ পড়েছেন। আকাইদে নাসাফি গ্রন্থটি তিনি মাওলানা আব্দুল মুমিন সাহেবের কাছে পড়েছেন। তিনি বলেন, তিন বছরের মধ্যে এক বছর প্রাইভেট এবং বাকি দুই বছর সরাসরি শ্রেণিকক্ষে পড়াশোনা করেছেন।
মাদ্রাসা পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে তিনি আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “সম্প্রতি বরুড়া মাদ্রাসায় গিয়ে দেখলাম আমার সময়ের কোনো শিক্ষক আর জীবিত নেই। আল্লাহ আমার শিক্ষকদের জান্নাতের উচ্চ মর্যাদা দান করুন।”

দেশবাসীর প্রতি শেষ আহ্বান: সাক্ষাৎকারের শেষে ডক্টর হেলাল দেশবাসী ও বরুড়াবাসীর উদ্দেশে বলেন, “একে অপরের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আমরা কাজ করব। কেউ কারও বাধা হয়ে দাঁড়াবেন না। প্রতিবাদী হব কিন্তু কেউ কারও ওপর জুলুম করব না।”

সাক্ষাৎকার গ্রহণ: মোহাম্মদ আনজার শাহ
স্থান: বরুড়া, কুমিল্লা
প্রকাশ: দৈনিক স্বাধীন সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *