শ্রীপুরে বৃদ্ধকে অপহরণ করে জোরপূর্বক জমি লিখে নেয়ার অভিযোগ — সাব-রেজিস্ট্রারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন

স্টাফ রিপোর্টার: 

গাজীপুরের শ্রীপুরে এক বৃদ্ধকে অপহরণ করে ভয়ভীতি দেখিয়ে জোরপূর্বকভাবে জমির দলিলে টিপসহি নেয়ার অভিযোগ উঠেছে একদল প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে। ঘটনাটি ঘটেছে চলতি বছরের ২৭ অক্টোবর ২০২৫, বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে। ভুক্তভোগীর মেয়ে সুফিয়া খাতুন (৩৭) শ্রীপুর থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।

অভিযোগে বলা হয়েছে, সুফিয়া খাতুনের পিতা মোঃ সাহাজ উদ্দিন (৭০), সাং-চয়াপাড়া, ওয়ার্ড নং-০৭, শ্রীপুর, গাজীপুর—তিনি প্রায় তিন বছর আগে নিজ মালিকানাধীন ১০ শতাংশ জমি বিক্রির জন্য একটি রেজিস্ট্রি বায়না দলিল সম্পাদন করেন বিবাদী মোঃ হলুদ মিয়া (৫০) ও দলিল লেখক শহিদুল ইসলাম (৪০)-এর মাধ্যমে। তবে বায়নার টাকা দীর্ঘ সময়েও প্রদান করা হয়নি। পরবর্তীতে সাহাজ উদ্দিন একাধিকবার তাদের কাছে বায়নার টাকা ফেরত চাইলেও তারা কালক্ষেপণ করতে থাকে।

অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ২৭ অক্টোবর বিকাল চারটার দিকে সাহাজ উদ্দিন চরমোনাই ওয়াজ মাহফিলে যাওয়ার পথে শ্রীপুর মোড়ে পৌঁছালে আজিজ আলম কায়সার (৬০), হলুদ মিয়া (৫০), **শহিদুল ইসলাম (৪০)**সহ মোট ১৪ জন বিবাদী এবং অজ্ঞাতনামা আরও ১০-১৫ জন ব্যক্তি পূর্বপরিকল্পিতভাবে তার পথরোধ করে। তারা বৃদ্ধকে মারধর, টানা-হেঁচড়া করে একটি অটোরিকশায় জোরপূর্বক তুলে নেয় এবং প্রায় এক ঘণ্টা তাকে আটক রেখে বিভিন্ন স্থানে ঘুরাতে থাকে।

পরবর্তীতে বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে তারা সাহাজ উদ্দিনকে শ্রীপুর সাবরেজিস্ট্রি অফিস সংলগ্ন জিএস টাওয়ারের পূর্ব পাশে অবস্থিত শহিদুল ইসলামের অফিসে নিয়ে যায়। সেখানে দেশীয় অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে বৃদ্ধকে বায়না দলিল বাতিল ও নতুন করে সাব-কাবলা দলিলে টিপসহি দিতে বাধ্য করে।

সুফিয়া খাতুনের অভিযোগ, পরে একই দিন সন্ধ্যা ৬টার দিকে তারা তার পিতাকে সাবরেজিস্ট্রার সোহেল রানার কক্ষের সামনে নিয়ে গিয়ে জোরপূর্বক দলিল সম্পাদন করায়। দলিল নং ১২১২০, তারিখ ২৭/১০/২০২৫। সাহাজ উদ্দিন সেই সময় চিৎকার করে জানান যে তিনি জমি বিক্রি করেননি, জোরপূর্বক তার টিপসহি নেয়া হয়েছে এবং তিনি কোনো টাকা পাননি। তবুও সাবরেজিস্ট্রার বিষয়টি উপেক্ষা করে দলিলটি সম্পন্ন করেন।

অভিযোগে বলা হয়, দলিল সম্পাদনের পর বিবাদীরা অফিস থেকে বের হয়ে রাস্তার পাশে সাহাজ উদ্দিনকে ফেলে যায়। জমির বিপরীতে দেখানো ৩৮ লাখ ৯৫ হাজার টাকা তারা প্রদান না করেই চলে যায়। ঘটনাস্থলে উপস্থিত স্থানীয়রা অসুস্থ অবস্থায় সাহাজ উদ্দিনকে উদ্ধার করে শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাকে ময়মনসিংহ কমিউনিটি বেইজড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

সুফিয়া খাতুন বলেন,

“আমার বাবা এখনো অসুস্থ। বিবাদীরা এখন আমাদেরও ভয়ভীতি দেখাচ্ছে যে, আমরা যদি আইনের আশ্রয় নেই তাহলে আমাদের মেরে ফেলবে।”

তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, এই ঘটনায় সাব-রেজিস্ট্রার সোহেল রানার ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, ভুক্তভোগী প্রকাশ্যে দলিলের বিরোধিতা করলেও তিনি আইন অনুযায়ী দলিল স্থগিত না করে বরং সম্পাদন করেছেন।

অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, এই পুরো প্রতারণামূলক কাজের পেছনে ছিল স্থানীয় একদল প্রভাবশালী সাংবাদিক ও সংগঠনের নেতাদের প্রত্যক্ষ ভূমিকা।
বিশেষ করে শ্রীপুর উপজেলা প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক টিপু সুলতান ও তথাকথিত সাংবাদিক মালেক—এই দুই ব্যক্তির নাম বারবার উঠে আসছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তাদের নেতৃত্বেই এই অপহরণ ও জোরপূর্বক দলিল সম্পাদনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।

স্থানীয়রা জানান,

“স্বৈরাচার সরকার পতনের আগে টিপু সুলতান সারাদিনে একটি সিগারেট খেতে পারতো। এখন সে এক বছরে পাঁচ তলা ভবনের মালিক! এই সম্পদের উৎস কোথায়?”

আরও অভিযোগ উঠেছে, সাংবাদিক পরিচয়ে আলোচনায় থাকা মালেক তার স্ত্রীকে ভরণপোষণ না দেওয়ায় বর্তমানে তার তৃতীয় স্ত্রীকে রাস্তার দোকানে বসিয়ে সংসার চালাতে হচ্ছে। স্থানীয়দের ভাষায়,

“মালেকের হারাম উপার্জন এখন প্রকাশ্য, অথচ সে নিজেকে সাংবাদিক পরিচয়ে ঢেকে রাখে।”

এ বিষয়ে স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা বলছেন, টিপু সুলতান ও মালেকের নামে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অনিয়ম, চাঁদাবাজি, মিথ্যা প্রতিবেদন তৈরি এবং জমি দখল–সংক্রান্ত অভিযোগ রয়েছে। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে তাদের অপকর্মের নতুন অধ্যায় যুক্ত হলো, যা স্থানীয়ভাবে “দুই চোরের নতুন আমলনামা” নামে আলোচিত হচ্ছে।

এ বিষয়ে শ্রীপুর থানার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করা হয়েছে। তদন্তের পর অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আইনজীবী মহল মনে করছে, এই ঘটনায় অপহরণ, জোরপূর্বক দলিল সম্পাদন, প্রতারণা ও দুর্নীতির একাধিক অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, যা দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারায় ফৌজদারি মামলা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

ঘটনাটি বর্তমানে শ্রীপুরে তীব্র আলোচনার সৃষ্টি করেছে। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—একজন বৃদ্ধের টিপসহি জোর করে নেয়া, পুলিশ পরিচয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন, এবং স্থানীয় সাংবাদিকদের সম্পৃক্ততা—এসবের পরও প্রশাসন কেন নীরব?

ভুক্তভোগী পরিবার এখন প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে ঘটনার স্বচ্ছ তদন্ত ও অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *