ষড়যন্ত্রের শিকার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শরীফ হোসেনসহ একাধিক সিনিয়র কর্মকর্তা

হাবিবুর রহমান :


স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি)-তে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের (বিপিপি) নামে তৈরি একাধিক ভুয়া শাখা কমিটির ট্যাগ ব্যবহার করে জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীদের পরিকল্পিতভাবে পদোন্নতি বঞ্চিত করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এই ষড়যন্ত্রের প্রধান শিকারদের একজন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মোঃ শরীফ হোসেন, যিনি ১৯৯২ সালের ২৬ নভেম্বর পিএসসি সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে এলজিইডিতে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে যোগদান করেন এবং দীর্ঘ তিন দশকের বেশি সময় সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এলজিইডির সদর দপ্তরের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ একটি বিএনপি-পন্থী প্রকৌশলী গোষ্ঠীর হাতে চলে যায়। এরপর থেকেই একটি সংঘবদ্ধ দুষ্টচক্র তাদের অপছন্দের ও অরাজনৈতিক কর্মকর্তাদের পদোন্নতি ও পদায়ন ঠেকাতে সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। এই ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয় বিপিপির নাম ও পরিচিতি।

বিপিপির নামে ১০১ সদস্যের একাধিক ভুয়া কমিটি!

অনুসন্ধানে জানা যায়, এলজিইডিতে ২০০৯ সালের পর বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের কোনো বৈধ শাখা কমিটি ছিল না। অথচ বিস্ময়করভাবে ১০১ সদস্যবিশিষ্ট একাধিক তথাকথিত আহ্বায়ক কমিটির তালিকা তৈরি করে তাতে এলজিইডির অরাজনৈতিক, প্রথিতযশা ও জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীদের নাম জুড়ে দেওয়া হয়—যাদের অনেকেই জীবনে কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না।

এই ভুয়া তালিকাই স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগে পাঠানো হয়। অভিযোগ রয়েছে, কোনো প্রকার যাচাই-বাছাই ছাড়াই একটি পূর্বপরিকল্পিত প্রক্রিয়ায় বিএনপি-পন্থী একজন যুগ্ম সচিবের মাধ্যমে তালিকার কপি পাঠানো হয় রাষ্ট্রের সংবেদনশীল গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআইতে। পরবর্তীতে সেই তথাকথিত গোয়েন্দা প্রতিবেদনের অজুহাতে শরীফ হোসেনসহ কয়েকজন প্রকৌশলীর নাম চলতি দায়িত্ব স্থায়ীকরণের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়।

২২টি পদের বিপরীতে ১৩টি পদোন্নতি, বাদ পড়লেন ৯ জন

সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে এলজিইডির প্রশাসন বিভাগ ২২টি শূন্য তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদের বিপরীতে ৭২ জন জ্যেষ্ঠ নির্বাহী প্রকৌশলীর নামের তালিকা স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব বরাবর পাঠায়। এর মধ্যে ৩০ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে মাত্র ১৩ জনকে পদোন্নতি দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়, যা স্বাক্ষর করেন সিনিয়র সহকারী সচিব জেসমীন প্রধান।

কিন্তু বিস্ময়করভাবে এখনো ৯টি পদ শূন্য থাকা সত্ত্বেও তালিকাভুক্ত আরও ৯ জন জ্যেষ্ঠ নির্বাহী প্রকৌশলীকে শুধুমাত্র “বিপিপির সঙ্গে সম্পৃক্ত”—এই মিথ্যা দোহাই দিয়ে পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত করা হয়। নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, এই ৯ জনের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোঃ শরীফ হোসেনও রয়েছেন, যিনি কখনোই কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সদস্য ছিলেন না।

কারা চালাচ্ছে এই ভুয়া বিপিপি নাটক?

অনুসন্ধানে আরও বেরিয়ে আসে, ২০১২ সালে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোঃ আমজাদ হোসেন ও নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ আমিরুল ইসলাম খান নিজেদেরকে বিপিপির এলজিইডি শাখার আহ্বায়ক ও সদস্যসচিব হিসেবে পরিচয় দিতেন। আমজাদ হোসেন অবসর গ্রহণের পরও কোনো কেন্দ্রীয় অনুমোদন ছাড়াই এই কথিত কমিটির কার্যক্রম চালু রাখা হয় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত। পরবর্তীতে সাবেক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হাবিবুল আজিজসহ আরও কয়েকজনকে পর্যায়ক্রমে কথিত আহ্বায়ক বানানো হয়—যার কোনো বৈধ কাগজপত্র বা সাংগঠনিক স্বীকৃতি নেই।

প্রশ্ন উঠছে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মন্ত্রণালয় ও এলজিইডির প্রশাসন বিভাগ কীভাবে যাচাই ছাড়াই এমন স্পর্শকাতর অভিযোগ গ্রহণ করে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের ক্যারিয়ার ধ্বংসের পথে ঠেলে দিচ্ছে? একজন সৎ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত শরীফ হোসেনের মতো কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ট্যাগ লাগিয়ে পদোন্নতি আটকে দেওয়া শুধু অন্যায়ই নয়, এটি রাষ্ট্রীয় সেবা ব্যবস্থাকে দুর্বল করার গভীর ষড়যন্ত্র বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

শরীফ হোসেনের পক্ষে জোরালো দাবি

শরীফ হোসেনের ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, তিনি আজীবন অরাজনৈতিক, নিরপেক্ষ ও পেশাদার কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁকে বিপিপির সদস্য দেখিয়ে যে তালিকা বানানো হয়েছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এই ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে কেবল তাঁকেই নয়, আরও কয়েকজন জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীকে টার্গেট করা হয়েছে, যাতে পছন্দের লোকদের পদোন্নতির পথ সুগম করা যায়।

তদন্তের দাবি

এই পরিস্থিতিতে এলজিইডির ভেতরে চলমান ভুয়া বিপিপি কমিটি নাটক, তালিকা প্রণয়ন, এনএসআইতে প্রেরণ এবং পদোন্নতি বঞ্চিত করার পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্তের জোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী প্রকৌশলীরা। তাঁদের বক্তব্য, দ্রুত এই ষড়যন্ত্রের মূলহোতাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দিলে এলজিইডিতে মেধা, সততা ও অভিজ্ঞতার কবর রচনা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *