বাংলাদেশে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও পেশাগত অধিকার নিশ্চিত করার প্রশ্নটি আবারও জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। জুলাই অভ্যুত্থানে নিহত সাংবাদিকদের বিচার, পেশাগত নিরাপত্তা, আইনি সুরক্ষা এবং সংবাদমাধ্যম মালিকদের দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করার দাবিতে বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠন ও পেশাজীবী মহল সোচ্চার হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গণতন্ত্রের ভিত শক্ত করতে হলে সাংবাদিকদের নির্ভয়ে কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
হামলা ও হয়রানি বৃদ্ধিতে উদ্বেগ
সাম্প্রতিক সময়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলা, হয়রানি ও মামলা বৃদ্ধির ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সাংবাদিক নেতারা। তাঁদের দাবি, দায়িত্ব পালনের সময় কোনো সাংবাদিক যেন নিরাপত্তাহীনতায় না ভোগেন, সে জন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে। বিশেষ করে ২০২৬ সালে অনুষ্ঠিতব্য বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় ইস্যু কাভার করতে গিয়ে সাংবাদিকদের নির্বিঘ্ন চলাচল এবং তথ্য সংগ্রহের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
জুলাই অভ্যুত্থানে নিহতদের বিচার দ্রুত করার দাবি
সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও আইনি সুরক্ষা প্রসঙ্গে নেতারা বলেন, সাংবাদিকের ওপর হামলা বা প্রতিশোধমূলক মামলার ঘটনা ঘটলে দ্রুত তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধ না হলে স্বাধীন সাংবাদিকতা বাধাগ্রস্ত হবে এবং সত্য প্রকাশের পথ সংকুচিত হয়ে পড়বে। জুলাই অভ্যুত্থানে নিহত সাংবাদিকদের বিচার দ্রুত সম্পন্ন করার দাবিও নতুন করে জোরালো হয়েছে।
পেশাগত অধিকার নিয়ে প্রশ্ন
পেশাগত অধিকার নিয়েও উঠেছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। সাংবাদিকরা বলছেন, নিয়মিত ও সময়মতো বেতন—ভাতা প্রদান এখনও অনেক প্রতিষ্ঠানে নিশ্চিত হয়নি। এতে পেশাগত স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হচ্ছে। একই সঙ্গে দায়িত্ব পালনের সময় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অযাচিত বাধা, হয়রানি ও জিজ্ঞাসাবাদ বন্ধ করার দাবি জানানো হয়েছে। সাংবাদিকদের মতে, দায়িত্ব পালনে বাধা মানেই জনগণের জানার অধিকার হরণ করা।
তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে
তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করার বিষয়টিকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে নির্বাচন, রাজনৈতিক কর্মসূচি বা জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট ঘটনায় সাংবাদিকদের তথ্য সংগ্রহে কোনো ধরনের নিষেধাজ্ঞা বা অঘোষিত বাধা আরোপ করা যাবে না। সাংবাদিকদের চলাচল ও তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত না হলে সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয় বলে মত দিয়েছেন বিশ্লেষকরা।
সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় মালিকদের দায়িত্ব
সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। সাংবাদিক নেতারা বলেন, সরকারি বা কোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠীর চাপ, নিয়ন্ত্রণ বা ভয়ভীতির পরিবেশ সৃষ্টি হলে সংবাদ প্রকাশের স্বাধীনতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের পাশাপাশি সংবাদমাধ্যম মালিকদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। মালিকপক্ষের কোনো অন্যায় সিদ্ধান্ত বা চাপ যেন সংবাদকর্মীদের পেশাগত নৈতিকতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয়, সেদিকেও নজর দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
‘সাংবাদিকতার অধিকার সুরক্ষা অধ্যাদেশ’ প্রণয়নের উদ্যোগ
এদিকে, তথ্য উপদেষ্টা সাংবাদিকদের অধিকার সুরক্ষায় একটি ‘সাংবাদিকতার অধিকার সুরক্ষা অধ্যাদেশ’ নিয়ে কাজ করছেন বলে জানা গেছে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সাংবাদিকদের আইনি সুরক্ষা আরও সুসংহত হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন পেশাজীবীরা। প্রস্তাবিত অধ্যাদেশে সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় নিরাপত্তা, হামলাকারীদের শাস্তি, প্রতিশোধমূলক মামলা থেকে সুরক্ষা এবং তথ্য সংগ্রহের অবাধ অধিকার নিশ্চিত করার বিধান রাখা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
গণতন্ত্র শক্তিশালীকরণে সাংবাদিকদের ভূমিকা অপরিহার্য
সার্বিকভাবে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, পেশাগত স্বাধীনতা ও অধিকার নিশ্চিত করার দাবিগুলো আরও স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নির্ভয়ে ও নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের পরিবেশ নিশ্চিত হলেই কেবল গণমাধ্যম তার প্রকৃত ভূমিকা পালন করতে পারবে, আর তাতেই শক্তিশালী হবে গণতন্ত্র ও জবাবদিহির সংস্কৃতি। সাংবাদিকরা জনগণের চোখ ও কান হিসেবে কাজ করেন। তাঁদের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করা মানে জনগণের জানার অধিকার নিশ্চিত করা। এই দায়িত্ব শুধু সরকার বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নয়, বরং সমাজের সকল স্তরের মানুষের।
লেখক: মোঃ আনজার শাহ সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার স্বাধীন সংবাদ কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক, বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড প্রেস সোসাইটি সহ দপ্তর সচিব কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ জাতীয় সাংবাদিক সংস্হা