সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে ইতিহাসের সর্ববৃহৎ অভিযান

কামরুল ইসলাম:

চট্টগ্রামের ইতিহাসে সন্ত্রাস দমনে পরিচালিত সবচেয়ে বড় সমন্বিত অভিযানে সন্ত্রাসীদের দীর্ঘদিনের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সোমবার ভোর থেকে শুরু হওয়া এই বিশাল অভিযানে সেনাবাহিনী, পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ও এপিবিএনের প্রায় চার হাজার সদস্য অংশ নেন। অভিযানে সাঁজোয়া যান, ড্রোন, হেলিকপ্টার এবং ডগ স্কোয়াড ব্যবহার করে আকাশ ও স্থলপথে একযোগে নজরদারি চালানো হয়।

অভিযান চলাকালে বেশ কয়েকজন সন্ত্রাসীকে আটক করা হয়েছে এবং উদ্ধার করা হয়েছে বিপুল পরিমাণ দেশি ও বিদেশি অস্ত্র। তবে উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা এবং আটক ব্যক্তিদের বিস্তারিত পরিচয় অভিযানের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তির পর জানানো হবে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ বিষয়ে আজ চট্টগ্রাম রেঞ্জ পুলিশের ডিআইজি আনুষ্ঠানিক ব্রিফিং করবেন বলে জানা গেছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুর্গম পাহাড়ি এলাকা জঙ্গল সলিমপুর দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। অবৈধ অস্ত্র মজুত, চাঁদাবাজি, অপহরণসহ নানা অপরাধের কেন্দ্র হিসেবে এলাকাটির পরিচিতি ছিল। সেই পরিস্থিতির অবসান ঘটাতে এবং রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতেই এ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।

জানা গেছে, এর আগে চার দফা পরিকল্পনা করা হলেও বিভিন্ন কারণে জঙ্গল সলিমপুরে বড় ধরনের অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হয়নি। তবে পঞ্চমবারের চেষ্টায় ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়ে এই অভিযান চালানো হয়। অভিযানের অংশ হিসেবে এলাকায় স্থায়ীভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে র‌্যাব ও পুলিশের দুটি ক্যাম্প স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র জানায়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় সোমবার ভোর ৫টা থেকে জঙ্গল সলিমপুর ও আশপাশের এলাকায় সমন্বিত অভিযান শুরু হয়। এতে প্রায় ৫৫০ জন সেনা সদস্য, ১ হাজার ৮০০ পুলিশ সদস্য, ৩৩০ জন এপিবিএন সদস্য, ৪০০ জন র‌্যাব সদস্য এবং ১২০ জন বিজিবি সদস্য অংশ নেন। অভিযানে সেনাবাহিনীর চারটি সাঁজোয়া যানসহ বড় একটি সামরিক বহর মোতায়েন করা হয়।

সকাল ১০টার পর থেকে ড্রোন ও হেলিকপ্টারের মাধ্যমে আকাশপথে নজরদারি আরও জোরদার করা হয়। পাহাড়ি ঝোপঝাড়ের মধ্যে কিংবা মাটির নিচে লুকিয়ে রাখা অস্ত্র, গোলাবারুদ বা বিস্ফোরক শনাক্ত করতে ডগ স্কোয়াডও ব্যবহার করা হয়। অভিযানে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট উপস্থিত থেকে আইনগত তদারকি করেন।

অভিযান চলাকালে চট্টগ্রামে কর্মরত সাংবাদিকেরা জঙ্গল সলিমপুরে প্রবেশ করতে চাইলে নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে প্রশাসন তাদের প্রবেশে বাধা দেয়। পরে বেলা ১১টার দিকে বায়েজিদ লিংক রোডে জঙ্গল সলিমপুরের প্রবেশমুখে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি নাজমুল হাসান।

তিনি বলেন, “সন্ত্রাসীদের আস্তানা গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের লক্ষ্যেই এই সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে এবং অস্ত্রও উদ্ধার হয়েছে। তবে অভিযান শেষ হলে বিস্তারিত তথ্য জানানো হবে।”

অন্যদিকে স্থানীয়দের কাছে ‘ছিন্নমূল মুখ’ নামে পরিচিত স্থানে দাঁড়িয়ে দুপুরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন চট্টগ্রাম রেঞ্জ পুলিশের ডিআইজি আহসান হাবিব পলাশ। তিনি বলেন, “জঙ্গল সলিমপুর দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রের ভেতরে যেন আরেকটি রাষ্ট্র হয়ে উঠেছিল। সেই পরিস্থিতির অবসান ঘটাতে এবং প্রশাসনের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতেই এই অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।”

তিনি আরও জানান, অভিযানের পর এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে স্থায়ীভাবে পুলিশ ও র‌্যাবের দুটি ক্যাম্প স্থাপন করা হবে।

চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মোহাম্মাদ নাজির আহমেদ খাঁন বলেন, “ভোর থেকেই অভিযান শুরু হয়েছে এবং পুলিশ, র‌্যাব ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা একযোগে এতে অংশ নিয়েছেন। ইতোমধ্যে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো শীর্ষ সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার হয়েছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না।”

সেহেরির পরপরই শুরু হওয়া অভিযানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে পাহাড়ি এলাকা ও আশপাশের বসতিগুলোতে তল্লাশি শুরু করেন। একটি দল পাহাড়ের নিচে বসবাসকারী মানুষের ঘরবাড়িতে তল্লাশি চালায়, অন্য একটি দল পাহাড়ি পথ ধরে ভেতরের দিকে অগ্রসর হয়ে সম্ভাব্য সন্ত্রাসীদের অবস্থান চিহ্নিত করার চেষ্টা করে।

অভিযান শুরুর আগেই সম্ভাব্য পালানোর পথগুলোতে চেকপোস্ট বসানো হয়, যাতে কোনো সন্ত্রাসী এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যেতে না পারে।

তবে অভিযান পরিচালনার শুরুতেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কিছু প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয়। কর্মকর্তাদের ধারণা, অভিযানের খবর আগেই পেয়ে সন্ত্রাসীরা রাতের অন্ধকারে বিভিন্ন স্থানে রাস্তা বন্ধ করে দেয়। কোথাও বড় ট্রাক রেখে ব্যারিকেড তৈরি করা হয়, আবার কোথাও কালভার্ট ভেঙে ফেলা হয় বা নালার স্ল্যাব খুলে রাখা হয়, যাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গাড়ি ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে।

বিশেষ করে আলীনগর এলাকায় প্রবেশ ঠেকাতে প্রধান সড়কের ওপর একটি ট্রাক রেখে ব্যারিকেড দেওয়া হয় এবং একটি কালভার্ট ভেঙে ফেলা হয়। পরে যৌথ বাহিনীর সদস্যরা ট্রাক সরিয়ে এবং ভাঙা কালভার্ট ইট ও বালু দিয়ে অস্থায়ীভাবে ভরাট করে ভেতরে প্রবেশ করেন।

প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর পাহাড়ি এলাকাজুড়ে বিস্তৃত জঙ্গল সলিমপুর চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী এলাকা থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত। দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই এটি অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত।

বর্তমানে এই এলাকায় প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার ঘরবাড়িতে অন্তত দেড় লাখ মানুষের বসবাস রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। তাদের মতে, প্রায় চার দশক ধরে সরকারি পাহাড় কেটে এখানে অবৈধ বসতি গড়ে উঠেছে এবং এখনো পাহাড় কেটে চলছে প্লট বাণিজ্য।

এই অবৈধ দখল ও জমি বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে এলাকাটিতে বিভিন্ন সময় সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর উত্থান ঘটে। ফলে জঙ্গল সলিমপুর দীর্ঘদিন ধরে অস্ত্র মজুত, সন্ত্রাসী কার্যক্রম এবং বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের আত্মগোপনের নিরাপদ স্থানে পরিণত হয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে জঙ্গল সলিমপুরে দুটি প্রধান সন্ত্রাসী পক্ষ সক্রিয় রয়েছে। একটি পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন মোহাম্মদ ইয়াসিন এবং অপর পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন রোকন উদ্দিন।

মোহাম্মদ ইয়াসিন গত জানুয়ারিতে র‌্যাবের ওপর হামলার ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলার প্রধান আসামি। ওই ঘটনায় র‌্যাব–৭ এর উপসহকারী পরিচালক (নায়েব সুবেদার) মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নিহত হন।

১৯ জানুয়ারি র‌্যাব সদস্যরা এলাকায় অভিযান চালাতে গেলে সন্ত্রাসীরা রামদা, কিরিচ ও লাঠিসোঁটা নিয়ে তাদের ওপর হামলা চালায়। এতে র‌্যাবের উপসহকারী পরিচালক মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নিহত হন এবং কয়েকজন র‌্যাব সদস্য আহত হন।

পরে সীতাকুণ্ড থানায় দায়ের করা মামলায় মোহাম্মদ ইয়াসিনসহ ২৯ জনের নাম উল্লেখ করা হয় এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরও প্রায় ২০০ জনকে আসামি করা হয়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা আশা করছেন, এই অভিযান জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় দীর্ঘদিনের সন্ত্রাসী কার্যক্রম দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং এলাকাটিতে স্থায়ীভাবে রাষ্ট্রের আইন ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *