সুন্দরবনে গোলপাতা আহরণে বাওয়ালীদের চরম সংকট: নৌকার মাপ ও বিএলসি নিয়ে তীব্র বিতর্ক

মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেন:

খুলনা বিভাগের সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের অধীনে গোলপাতা আহরণ কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে বাওয়ালী ও বনজীবীদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। বন বিভাগের কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি এবং অনৈতিক চুক্তির অভিযোগও উঠেছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিশেষ করে এক স্টেশন কর্মকর্তা বাওয়ালীদের সঙ্গে অনৈতিক চুক্তিতে গড়মিল এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় বাওয়ালী, নৌকা মালিক এবং বনজীবী সংগঠনের নেতারা। স্থানীয়রা বলছেন, বিএলসি (BLC – বন লিখিত চুক্তি) অনুযায়ী গোলপাতা আহরণের নিয়ম নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন সিদ্ধান্তের কারণে বর্তমানে হাজার হাজার বাওয়ালী চরম সংকটে পড়েছেন। তারা দাবি করেন, বন বিভাগের ভুল নীতি ও উদাসীনতার কারণে এ বছরের গোলপাতা মৌসুম প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে, যা সুন্দরবন উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রাকে সরাসরি প্রভাবিত করছে।

গোলপাতা আহরণ সুন্দরবন সংলগ্ন হাজারো পরিবারের প্রধান জীবিকোপাচারের একটি অংশ। সুন্দরবন উপকূলীয় এলাকায় মানুষ মাছ, কাঁকড়া, মধু এবং বনজ সম্পদ সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। বিশেষ করে গোলপাতা গ্রামের মানুষদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা ঘরবাড়ির ছাউনি তৈরিতে ব্যবহার হয়। দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য গোলপাতা একেবারে অপরিহার্য উপাদান। প্রতিবছর নির্দিষ্ট মৌসুমে বাওয়ালীরা সুন্দরবনে প্রবেশ করে গোলপাতা সংগ্রহ করেন এবং তা বাজারে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। স্থানীয়রা বলছেন, গোলপাতা শুধু একটি বনজ সম্পদ নয়, এটি গ্রামীণ অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা হাজার হাজার পরিবারকে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে জীবিকা দেয়।

বন বিভাগ সুন্দরবন থেকে বনজ সম্পদ আহরণের জন্য নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসারে বিএলসি (বন লিখিত চুক্তি) প্রদান করে থাকে। এই চুক্তির মাধ্যমে বাওয়ালীরা বৈধভাবে সুন্দরবনে প্রবেশ করে গোলপাতা সংগ্রহের অনুমতি পান। তবে এবারের মৌসুমে বিএলসি চুক্তির শর্তাবলী নিয়ে বড় ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাওয়ালীরা জানিয়েছেন, বিএলসি করার সময় নৌকার মাপ নির্ধারণ করা হয়েছিল এমনভাবে যা বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে মিলছে না। বন বিভাগের পুরনো নিয়ম অনুযায়ী বাওয়ালীদের ব্যবহৃত নৌকার ধারণক্ষমতা প্রায় ৫০০ মণ ধরা হয়েছিল, কিন্তু বর্তমানে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নৌকার আকার ও ধারণক্ষমতা বেড়ে প্রায় ১০০০ মণ পর্যন্ত হয়ে গেছে। বাওয়ালীরা অভিযোগ করেন, বন বিভাগ এই বাস্তবতা বিবেচনায় না নিয়ে পুরনো নিয়ম অনুযায়ী নৌকার মাপ নির্ধারণ করছে। ফলে বড় নৌকা নিয়ে সুন্দরবনে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না, যা তাদের জীবিকাকে সরাসরি প্রভাবিত করছে। একজন বাওয়ালী বলেন, “আমরা বহু বছর ধরে এই পেশার সঙ্গে জড়িত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নৌকার আকার বড় হয়েছে। এখন হঠাৎ করে বলা হচ্ছে নৌকা ছোট করতে হবে। এটা আমাদের জন্য অসম্ভব।”

স্থানীয় বাওয়ালী ও বনজীবীদের অভিযোগ, স্টেশন কর্মকর্তা মোঃ নাসির উদ্দীন বাওয়ালীদের সঙ্গে অনৈতিক চুক্তিতে গড়মিল করে অনিয়ম-দুর্নীতির আশ্রয় নিচ্ছেন। তাদের দাবি, কিছু ক্ষেত্রে নৌকা অনুমোদনের ক্ষেত্রে বৈষম্য করা হচ্ছে এবং নানা ধরনের প্রশাসনিক জটিলতা সৃষ্টি করা হচ্ছে। যদিও বন বিভাগের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি, তবে স্থানীয় বনজীবী সংগঠন এই বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। সুন্দরবন বনজীবী ব্যবসায়ী মালিক শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি মীর কামরুজ্জামান বাচ্চু বলেন, “খুলনার বিভাগীয় বন কর্মকর্তা সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের সিদ্ধান্তে নৌকার মালিকদের বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। বিএলসি করে টাকা নেওয়া হয়েছে কিন্তু এখন গোলপাতা আহরণের জন্য পারমিট দেওয়া হচ্ছে না। বাওয়ালীরা নিয়ম মেনে সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে, কিন্তু এখন এমন একটি মাপ নির্ধারণ করা হয়েছে যা বাস্তবে কার্যকর নয়। এতে হাজার হাজার শ্রমিক ও নৌকা মালিক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।”

বাওয়ালীরা বলছেন, এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে সরকারও বড় ধরনের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হবে। কারণ গোলপাতা আহরণের মাধ্যমে বন বিভাগ প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য রাজস্ব অর্জন করে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, গোলপাতা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে হাজার হাজার শ্রমিক, পরিবহন শ্রমিক, ব্যবসায়ী এবং স্থানীয় বাজার। তাই গোলপাতা মৌসুম বন্ধ হয়ে গেলে পুরো অঞ্চলের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। অনেক নৌকা মালিক ব্যাংক ও মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে বড় নৌকা তৈরি করেছেন। তারা আশঙ্কা করছেন, যদি নৌকা নিয়ে সুন্দরবনে প্রবেশের অনুমতি না দেওয়া হয়, তাহলে তারা আর্থিকভাবে ধ্বংস হয়ে যাবেন। একজন নৌকা মালিক বলেন, “আমরা ঋণ করে নৌকা বানিয়েছি। এখন যদি যেতে না পারি, ঋণ শোধ করব কীভাবে?”

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সুন্দরবনের মতো সংবেদনশীল বনাঞ্চলে বনজ সম্পদ আহরণ অবশ্যই বন আইন ও পরিবেশ সংরক্ষণ নীতিমালা অনুযায়ী পরিচালিত হতে হবে। বাংলাদেশের বন আইন ১৯২৭, বন সংরক্ষণ বিধিমালা এবং বন বিভাগের প্রশাসনিক নির্দেশনা অনুযায়ী বনজ সম্পদ আহরণের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। তবে একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকা রক্ষার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। এই সংকটের কারণে সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার বহু পরিবার মানবিক সংকটে পড়তে পারে। কারণ গোলপাতা মৌসুমই অনেক পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস। স্থানীয়রা বলছেন, যদি দ্রুত সমস্যার সমাধান না করা হয়, তাহলে হাজার হাজার মানুষ বেকার হয়ে পড়বে।

স্থানীয় বাওয়ালী ও বনজীবী সংগঠন এই বিষয়ে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাদের দাবি, নৌকার মাপ নির্ধারণ পুনর্বিবেচনা করা হোক, বিএলসি চুক্তির শর্ত বাস্তবসম্মত করা হোক এবং অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করা হোক। তারা বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সমস্যার সমাধানে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি—বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নৌকার মাপ নির্ধারণ, বিএলসি চুক্তির শর্ত পুনর্বিবেচনা, বাওয়ালী ও বনজীবীদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান, অনিয়মের অভিযোগের তদন্ত এবং বনজ সম্পদ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।

সুন্দরবন বাংলাদেশের একটি অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ। এই বন রক্ষা করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি বনের উপর নির্ভরশীল মানুষের জীবন-জীবিকাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান পরিস্থিতিতে বন বিভাগের নীতিমালা ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কারণে বাওয়ালীরা চরম সংকটে পড়েছেন। তাই বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করে বাস্তবসম্মত সমাধান বের করা প্রয়োজন, যাতে সুন্দরবনের বনজ সম্পদ সুরক্ষিত থাকে এবং বাওয়ালীদের জীবন-জীবিকাও অক্ষুণ্ণ থাকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *