মোহাম্মদ হোসেন (সুমন):
একসময় যিনি নিখোঁজ হয়ে দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন, দীর্ঘ অনিশ্চয়তা ও আইনি জটিলতার পথ পেরিয়ে সেই সালাহউদ্দিন আহমেদ এখন দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ঘিরে একসময় তার গুমের অভিযোগ উঠেছিল, আজ সেই বাহিনীই তার নেতৃত্বাধীন মন্ত্রণালয়ের অধীনে দায়িত্ব পালন করছে—এ ঘটনাকে অনেকেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক বিরল ও নাটকীয় অধ্যায় হিসেবে দেখছেন।
মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির কাছে শপথ নিয়ে তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-এর স্থায়ী কমিটির এই সদস্যের শপথগ্রহণকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গন, বিশেষ করে কক্সবাজারে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে।
নির্বাচনে শক্ত অবস্থান
কক্সবাজার-১ (চকরিয়া-পেকুয়া) আসন থেকে টানা চতুর্থবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি নিজের রাজনৈতিক অবস্থান আরও সুদৃঢ় করেছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয় তার নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ হিসেবে দেখছেন দলীয় নেতারা। শুধু নিজ আসনেই নয়, জেলার অন্যান্য আসনেও প্রচারণায় সক্রিয় ভূমিকা রেখে দলীয় প্রার্থীদের বিজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন বলে দাবি করা হচ্ছে।
গুম, সন্ধান ও প্রত্যাবর্তন
২০১৫ সালের ১০ মার্চ ঢাকার উত্তরা এলাকা থেকে নিখোঁজ হন সালাহউদ্দিন আহমেদ। পরিবার ও দলের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাকে তুলে নিয়ে গেছে। টানা ৬২ দিন তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। পরে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিলং শহরে তার সন্ধান মেলে। সেখান থেকেই শুরু হয় দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া ও কার্যত নির্বাসিত জীবন। প্রায় নয় বছর পর ২০২৪ সালের আগস্টে দেশে ফিরে আবার সক্রিয়ভাবে জাতীয় রাজনীতিতে যুক্ত হন তিনি।
শৈশব, শিক্ষা ও রাজনৈতিক উত্থান
১৯৬২ সালের ৩০ জুন পেকুয়া উপজেলার সিকদারপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন সালাহউদ্দিন আহমেদ। সম্ভ্রান্ত মৌলভী পরিবারে বেড়ে ওঠা এই রাজনীতিকের পিতা মৌলভী ছাঈদুল হক এবং মাতা আয়েশা হক। পেকুয়ার শিলখালী উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর আইন বিভাগ থেকে এলএলবি ও এলএলএম ডিগ্রি অর্জন করেন।
ছাত্রজীবনেই জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল-এর রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ও পরে ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকার কারণে একাধিকবার কারাবরণও করতে হয়েছে তাকে।
প্রশাসন থেকে রাজনীতিতে
১৯৮৫ সালে সপ্তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে উত্তীর্ণ হয়ে ১৯৮৮ সালে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন এবং বগুড়া জেলা প্রশাসনে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া-র সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) হিসেবে নিয়োগ পান। তবে ১৯৯৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে সরাসরি রাজনীতিতে সক্রিয় হন।
একই বছর মাত্র ৩৪ বছর বয়সে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। ২০০১ সালে চারদলীয় জোট সরকার গঠনের পর যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন ২০০৬ সাল পর্যন্ত। স্বাধীনতার পর কক্সবাজার থেকে প্রথম প্রতিমন্ত্রী হিসেবে মন্ত্রিসভায় স্থান পাওয়া রাজনীতিকও ছিলেন তিনি। দীর্ঘ দুই দশক পর এবার জেলার প্রথম পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ায় এটিকে কক্সবাজারের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দলীয় রাজনীতিতে প্রভাব
জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও পরে দুবার সভাপতি হিসেবে সংগঠনকে শক্তিশালী করেন সালাহউদ্দিন আহমেদ। ২০১০ সালের জাতীয় কাউন্সিলে যুগ্ম মহাসচিব এবং পরবর্তীতে জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পান। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, প্রশাসনিক পটভূমি এবং সংগঠনের ভেতরে প্রভাবের কারণেই তাকে মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া ও প্রত্যাশা
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর কক্সবাজার শহর, চকরিয়া ও পেকুয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় আনন্দ মিছিল বের হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও শুভেচ্ছা ও অভিনন্দনের বার্তা ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়দের অনেকেই এটিকে জেলার দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের স্বীকৃতি হিসেবে দেখছেন।
জেলা বিএনপির নেতাদের মতে, তার নেতৃত্বে সংগঠন নতুন করে উজ্জীবিত হয়েছে এবং নির্বাচনে জেলার চারটি আসনে বিজয় নিশ্চিত করতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। সাবেক হুইপ শাহজান চৌধুরীও তাকে বিচক্ষণ ও দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম নেতা হিসেবে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে সফল হওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্ত নিরাপত্তা, রোহিঙ্গা সংকট, মাদক নিয়ন্ত্রণ এবং পর্যটন এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ—এসব গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে তার ভূমিকা এখন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হবে। কক্সবাজারসহ দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নেও তার অভিজ্ঞতা কাজে লাগবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসা সালাহউদ্দিন আহমেদের এই যাত্রা নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী। এখন সময়ই বলে দেবে, অতীতের অভিজ্ঞতা ও দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলাকে কাজে লাগিয়ে তিনি দেশের আইনশৃঙ্খলা ও সুশাসনে কতটা কার্যকর পরিবর্তন আনতে পারেন।