৮০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ, দুই আসামির জামিনে হতাশ বাদী

স্টাফ রিপোর্টার:

একজন নারী উদ্যোক্তার ৮০ কোটি ২৩ লাখ ৭ হাজার ৫০০ টাকা আত্মসাতের মামলায় দুই আসামিকে জামিন দিয়েছেন ঢাকার একটি আদালত। জামিনের ঘটনায় ন্যায়বিচার পাবেন কি না, তা নিয়ে বাদী হতাশ হয়ে পড়েছেন।

গত মঙ্গলবার ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলাম এই জামিন দেন।

বাদীর আইনজীবী রাজু এইচ পলাশ জামিনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, এ মামলার দুই আসামি আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন চান। আসামিরা বাদীর চেক ও লেনদেন-সংক্রান্ত বিষয়ে আপস করবেন বলে আদালতকে লিখিতভাবে জানান।

আদালত আগামী ২৭ তারিখ আপসের শর্তে জামিন দিয়েছেন। আইনজীবী বলেন, এত টাকা আত্মসাতের মামলায় কিছু টাকা পরিশোধ না করলে সাধারণত আদালত জামিন দেন না। শুধু আপস করবেন বলে লিখিত গ্রহণ করে জামিন দেওয়া হয়েছে। এতে বাদী ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

আইনজীবী আরও বলেন, আসামিরা একটি সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র। এদের পেছনে আরও অনেকে আছে। শুধু জনকণ্ঠ গ্রুপ থেকেই ৮০ কোটিরও বেশি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। আত্মসাৎকৃত টাকার একটি বড় অংশ তারা কানাডা ও মালয়েশিয়ায় পাচার করেছেন বলেও জানা গেছে। এদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এরা বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। সুশাসন ও ন্যায়বিচারের জন্যই এদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া প্রয়োজন। অথচ এত টাকা আত্মসাতের মামলায় আদালত সহজেই জামিন দিয়ে দিয়েছেন।

এই মামলার বাদী হলেন শামীমা এ খান ওরফে শামীমা আতিকুল্লাহ খান। তিনি গ্লোব জনকণ্ঠ শিল্প পরিবার গ্রুপের চেয়ারম্যান। তিনি মোহাম্মদ আতিকুল্লাহ খান মাসুদের স্ত্রী।

মামলার আসামিরা হলেন রাজিয়া রহমান ওরফে বৃষ্টি, মো. মেসবাহউদ্দীন, মো. শওকত আলী ও মনোয়ারা বেগম ওরফে মনোয়ারা রিয়াজ।

গত ২৮ জানুয়ারি বাদী এই মামলা আদালতে দায়ের করেন। আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নিয়ে সমন ইস্যু করেন এবং ১৬ মার্চ আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেন। আদালতের নোটিশ পেয়েও আসামিরা হাজির না হলে ১৬ মার্চ তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। একই সঙ্গে বাদীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আসামিদের বিদেশযাত্রার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।

মামলার অভিযোগে বলা হয়, আসামি রাজিয়া রহমান ওরফে বৃষ্টি তার ঘনিষ্ঠ বান্ধবী শাহীন রহমানের মেয়ে। তারা আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল ছিলেন। রাজিয়াকে ছোটবেলা থেকেই নিজের সন্তানের মতো স্নেহ করতেন বাদী এবং পরিবারের সদস্য হিসেবে বিবেচনা করতেন। দীর্ঘদিন অস্বচ্ছল রাজিয়াকে বিভিন্ন সময় আর্থিক সহায়তা করেছেন। এক পর্যায়ে ২০২৪ সালের ৩ নভেম্বর রাজিয়াকে প্রতিষ্ঠানের ‘চিফ বিজনেস অফিসার’ পদে নিয়োগ প্রদান করেন। প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে সম্পূর্ণ আস্থার সঙ্গে যুক্ত করেন এবং যাতায়াতের জন্য গাড়ি প্রদান করেন। বিবাহের সম্পূর্ণ ব্যয় বহন করে প্রায় ৫০ লাখ টাকার স্বর্ণালংকার প্রদান করেন।

শামীমা আতিকুল্লাহ খান তার স্বামী আতিকুল্লাহ খান মাসুদের মৃত্যুর পর পারিবারিক ব্যবসার কিছু ব্যাংক ঋণ জটিল অবস্থায় পড়েন। তা নিয়মিত করার প্রয়োজন দেখা দেয়। এই সুযোগে নিজেকে অত্যন্ত বিশ্বস্ত ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন করেন রাজিয়া। তিনি দাবি করেন, ব্যাংক কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার সুসম্পর্ক রয়েছে।

আসামি রাজিয়া ব্যাংকের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন ও সমন্বয়ের দায়িত্ব নিজের হাতে নেন। তার প্ররোচনায় শামীমা আতিকুল্লাহ খান বনানী শাখার পূবালী ব্যাংকে একটি নতুন হিসাব খোলেন এবং রাজিয়াকে ওই হিসাবের নমিনি করা হয়।

এক পর্যায়ে বাদী জমি বিক্রি এবং অন্যান্য উৎস থেকে মোট ৮০ কোটি ২৩ লাখ ৭ হাজার ৫০০ টাকা ব্যাংক ঋণ সমন্বয়ের উদ্দেশ্যে জোগাড় করেন। রাজিয়া রহমান ও তার সহযোগীরা ব্যাংকের মাধ্যমে ঋণ সমন্বয়ের আশ্বাস দিয়ে শামীমার কাছ থেকে ওই অর্থ ও আর্থিক নথিপত্র নিজেদের দখলে নেন। গত বছরের ১ ফেব্রুয়ারি আসামি রাজিয়া অন্যান্য আসামিদের সঙ্গে নিয়ে মোট ৫৪টি ব্যাংক চেক বাদীর কাছ থেকে নেন। বাদী সরল বিশ্বাসে টাকার অঙ্ক উল্লেখ না করেই চেকগুলো আসামিদের দেন।

আসামি রাজিয়া ও অন্যান্যরা পরস্পর যোগসাজশে পুরো টাকাটাই ব্যাংক থেকে তুলে আত্মসাৎ করেন। এদিকে শামীমা দীর্ঘদিন ধরে রাজিয়ার কাছ থেকে আশ্বাস পেতে থাকেন যে ব্যাংক ঋণ সমন্বয়ের কাজ চলমান রয়েছে এবং সমস্ত অর্থ সে উদ্দেশ্যেই ব্যবহৃত হয়েছে।

গত বছরের ২৫ আগস্ট ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করে বাদী জানতে পারেন, ব্যাংক ঋণ সমন্বয়ের জন্য কোনো অর্থ জমা দেওয়া হয়নি। বরং ঋণ পরিশোধ না হওয়ায় ব্যাংক শামীমা ও তার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অর্থঋণ আদালতে একাধিক মামলা দায়ের করেছে।

পরবর্তীতে শামীমা ব্যাংক থেকে হিসাবের বিস্তারিত বিবরণ সংগ্রহ করে দেখতে পান, তার স্বাক্ষর করা চেকগুলোতে টাকার অঙ্ক ও তারিখ বসিয়ে অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে এবং তা রাজিয়াসহ অন্যদের বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করা হয়েছে।

শামীমা টাকা ও চেক ফেরত চাইলে রাজিয়াসহ অন্যরা যোগাযোগ এড়িয়ে যেতে শুরু করেন এবং অফিসে আসা বন্ধ করে দেন।

মামলার বাদী শামীমা এ খান বলেন, “প্রতারণামূলকভাবে আসামিরা আমার ৮০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন, যার সুস্পষ্ট দালিলিক প্রমাণও আমি আদালতে দিয়েছি। আমি মামলা করেছি। আসামিরা আদালতে হাজির হয়ে জামিন নিয়েছেন। এত টাকা আত্মসাতের মামলায় জামিন দেওয়ায় আমি হতাশ হয়েছি। এত বড় অঙ্কের টাকা আত্মসাতের মামলায় জামিন পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য হুমকি। আমি দেশের একজন প্রবীণ নাগরিক এবং একটি জাতীয় পত্রিকার সম্পাদক। আমি খুবই হতাশ হয়েছি। আমি ন্যায়বিচার পাব কি না, তা নিয়ে সংশয়ে আছি।”

অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী তুষার কান্তি দাস সাংবাদিকদের জানান, “দুই আসামির জামিন হয়েছে। আদালত আপসের শর্তে জামিন দিয়েছেন। এক নম্বর আসামি রাজিয়া দেশের বাইরে থাকায় তিনি আদালতে হাজির হননি। তিনি দেশে এলে বিষয়টি বাদীর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে সমাধান করা হবে।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *