নেত্রকোনায় মানব পাচার চক্রের সন্ধান: চীনা নাগরিকসহ দুই দালাল আটক, তিন ভুক্তভোগী তরুণী উদ্ধার

নেত্রকোনা প্রতিনিধি:

নেত্রকোনায় মানব পাচার চক্রের একটি বড় কাণ্ড উদ্ঘাটিত হয়েছে। জেলার কেন্দুয়া থানা পুলিশ চীনের এক নাগরিক ও তার স্থানীয় সহযোগীকে আটক করেছে মানব পাচারে জড়িত থাকার সন্দেহে। একই সঙ্গে তিন তরুণী ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

অভিযানের বিস্তারিত

সোমবার (১৫ সেপ্টেম্বর) দুপুর দেড়টার দিকে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করেন নেত্রকোনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর)। আটককৃতরা হলেন— চীনা নাগরিক লি ওই হাও (Li Wei Hao) এবং তার সহযোগী দালাল মো. ফরিদুল ইসলাম, যিনি কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার সুখদেব পশ্চিমপাড়া গ্রামের আব্দুল হানিফ মিয়ার ছেলে।

অন্যদিকে, উদ্ধার হওয়া ভুক্তভোগীরা হলেন—

  • নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার কমলপুর গ্রামের রুবেল মিয়ার মেয়ে আলফা আক্তার (১৮),

  • একই উপজেলার মোজাফরপুর ইউনিয়নের মহর উদ্দিনের মেয়ে লিজা আক্তার (২০) এবং

  • জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলার গোপী নদী গ্রামের বৃষ্টি (১৭)

সন্দেহজনক বিয়ে ও প্রতারণার ফাঁদ

পুলিশ জানায়, আটককৃত চীনা নাগরিক লি ওই হাও চলতি মাসের ১ সেপ্টেম্বর কেন্দুয়ার গার্মেন্টসকর্মী আলফা আক্তারকে বিয়ে করেন। তিনি জানান, আসন্ন ২০ সেপ্টেম্বর তিনি আলফাকে নিয়ে চীনে চলে যাবেন। এ সময় কনের পরিবারের সদস্যদেরও তিনি আশ্বস্ত করেন যে, আলফাকে বিয়ে করে চীনে নিয়ে যেতে পরিবারের লোকজনকে এক লাখ টাকা প্রদান করবেন।

এ উদ্দেশ্যে আলফা আক্তার তার পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে কমলপুর গ্রামে আসেন এবং সঙ্গে ছিলেন চীনা স্বামী লি ওই হাও, দালাল ফরিদুল ইসলাম ও আরও দুই তরুণী। তদন্তে জানা যায়, জামালপুরের কিশোরী বৃষ্টি সম্প্রতি আরেক চীনা নাগরিককে বিয়ে করেছেন বলে দাবি করা হয়। এতে করে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়।

স্থানীয়দের সন্দেহ ও পুলিশের তৎপরতা

পরিবারের সদস্যরা যখন চীনা নাগরিকের কাছ থেকে পাসপোর্ট, ভিসা ও অন্যান্য বৈধ কাগজপত্র দেখতে চান, তিনি কিছুই দেখাতে পারেননি। তার সহযোগী ফরিদুল ইসলামও কোনো বৈধ নথি প্রদর্শন করতে ব্যর্থ হন। এতে স্থানীয়রা বিষয়টি মানব পাচারের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারে বলে সন্দেহ করে তাদের অবরুদ্ধ করে ফেলে এবং সঙ্গে সঙ্গে থানায় খবর দেন।

খবর পেয়ে কেন্দুয়া থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে চীনা নাগরিক ও তার দালালকে আটক করে থানায় নিয়ে আসে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তাদের কথাবার্তায় অসংলগ্নতা ধরা পড়ায় পুলিশ তাদের হেফাজতে রাখে।

পুলিশের বক্তব্য

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর) জানান, প্রাথমিক তদন্তে বিষয়টি মানব পাচার চক্রের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে ধারণা করা হচ্ছে। উদ্ধার হওয়া তরুণীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে এবং আটক দুইজনকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানা হেফাজতে রাখা হয়েছে। এ ঘটনায় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

মানব পাচার আতঙ্কে সীমান্তবর্তী জেলা

নেত্রকোনার মতো সীমান্তবর্তী এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই মানব পাচারের নানা অভিযোগ শোনা যাচ্ছে। বিশেষ করে বিদেশে বিয়ে করিয়ে দেওয়ার নাম করে তরুণীদের প্রলোভনে ফেলার ঘটনা নতুন নয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ ধরনের চক্র শুধু চীন নয়, বিভিন্ন দেশে সক্রিয় থেকে তরুণীদের প্রতারণার ফাঁদে ফেলছে।

স্থানীয়রা এ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে দ্রুত দোষীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *