মোহাম্মদ হোসেন হ্যাপী,ব্যুরো চিফ:
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গডফাদার পরিবর্তন করেছে দলিল লেখক রফিকুল ইসলাম ও কলিমুল্লাহ। নারায়ণগঞ্জ জেলা রেজিস্ট্রি অফিসকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য দলিল লেখক সমিতির এই দুই শীর্ষ নেতা গডফাদার পরিবর্তন করে নিজেদের আধিপত্য ধরে রেখেছেন।
একাধিক দলিল লেখক জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর কলিমুল্লাহ গণধোলাইয়ের শিকার হয়। বেশ কিছুদিন আত্মগোপনে ছিলেন রফিকুল ইসলাম। স্থানীয় বিএনপির একাধিক নেতার সঙ্গে আতাঁত করে প্রকাশ্যে ফিরে আসেন শামীম ওসমান ও আজমেরী ওসমানের আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত রফিক-কলিম।
নারায়ণগঞ্জ জেলা রেজিস্ট্রি অফিসকে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দুর্নীতির অন্যতম প্রতিষ্ঠানে রূপ দিয়েছিলেন রফিকুল ইসলাম ও কলিমুল্লাহ গং। সে সময় তারা শামীম ওসমান, আজমেরী ওসমান ও অয়ন ওসমানের নাম ব্যবহার করে দলিল লেখকদের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করতেন।
অফিসের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি জানান, শুধু দলিল লেখকদের মধ্যেই তাঁদের প্রভাব সীমাবদ্ধ ছিল না, রাজনৈতিক পরিচয়ে তাঁরা সাব-রেজিস্ট্রারকেও প্রভাবিত করতেন। উভয়েই আওয়ামী লীগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতেন। তাঁরা তাঁদের মতো করে নারায়ণগঞ্জ জেলা রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সটি নিজস্ব বাহিনী দিয়ে পরিচালনা করতেন।
প্রয়াত সাবেক সাংসদ নাসিম ওসমানের একমাত্র ছেলে, নারায়ণগঞ্জে অপরাধীদের আইকন হিসেবে পরিচিত আজমেরী ওসমানের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে রফিক ও কলিমুল্লাহ ছিলেন জেলা রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সের নিয়ন্ত্রক এবং গডফাদার। এ দুইজনের নির্দেশে যাঁরা নিয়ন্ত্রণ করতেন তারা হলেন সফর আলী ভূঁইয়া স্বপন, তপু, গোলাম সারওয়ার শুভ, কাজী সবুজ গং বাহিনী।
সূত্র জানায়, রফিকুল ইসলাম ছিলেন গডফাদার শামীম ওসমানের ঘনিষ্ঠজন। সে পরিচয়ের সূত্র ধরেই নারায়ণগঞ্জ জেলা রেজিস্ট্রি অফিসে দাপট দেখিয়ে অঢেল সম্পদের মালিক বনে গেছেন তিনি। শামীম ওসমানের সঙ্গে সখ্যতা থাকায় রফিকের বিরুদ্ধে কেউ কথা বলতেন না।
রেজিস্ট্রি অফিসে আরেক প্রভাবশালী ছিলেন কলিমুল্লাহ। তিনি ছিলেন নারায়ণগঞ্জের শীর্ষ সন্ত্রাসী আজমেরী ওসমানের আস্থাভাজন। সব কিছুতেই আজমেরী ওসমানের নাম ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তার করেছেন তিনি।
দলিল লেখক সমিতির এই দুই নেতা নারায়ণগঞ্জ জেলা রেজিস্ট্রি অফিসে সাধারণ মানুষের জমি রেজিস্ট্রি করতে গেলে সরকারি ফি ছাড়াও অতিরিক্ত ফি আদায় করতেন সমিতির পক্ষে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে অতিরিক্ত ফি আদায় করলেও বর্তমানে তা অব্যাহত রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আদায়কৃত অতিরিক্ত টাকাগুলো সাবেক সাংসদ শামীম ওসমান, তার ছেলে অয়ন ওসমান ও ভাতিজা আজমেরী মুক্ত ওসমানসহ অনেক রাঘববোয়ালের মাঝে বণ্টন করতেন সভাপতি রফিকুল ইসলাম রফিক ও সাধারণ সম্পাদক কলিমুল্লাহ। বর্তমানে বিএনপির একাধিক সিন্ডিকেটের মাঝেও তা বণ্টন করা হচ্ছে বলে সূত্রের দাবি।
নারায়ণগঞ্জ জেলা রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সে জমির রেজিস্ট্রি করতে আসা ভুক্তভোগী অনেকেই বলেন, “আমরা অত্র প্রতিষ্ঠানে রফিকুল ইসলাম ও কলিমুল্লাহ গং-এর কাছে জিম্মি। সরকার নির্ধারিত ফি ছাড়াও অতিরিক্ত ফি দিতে বাধ্য হয়েছি।” তাঁরা তাঁদের সংগঠনের জন্য নিয়মবহির্ভূতভাবে হাতিয়ে নিতেন লক্ষ লক্ষ টাকা, যা সরকারের কোষাগারে জমা না হয়ে যেত তাঁদের ব্যক্তিগত কোষাগারে। আর এই টাকাগুলোর বড় অংশই দেওয়া হতো ওসমান পরিবারকে।
তাঁরা আরও বলেন, গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করলে তার সঙ্গে শামীম ওসমান, আজমেরী ওসমান, অয়ন ওসমানসহ তাদের ক্যাডাররাও আত্মগোপনে চলে গেছেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের এক বছর অতিবাহিত হলেও রফিকুল ইসলাম ও কলিমুল্লাহ গং এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছে। তারা এখনও পর্যন্ত জমি রেজিস্ট্রি করতে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে পূর্বের ন্যায় টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সরকার পতনের পর সাধারণ মানুষের মাঝে অনেকটা স্বস্তি ফিরলেও নারায়ণগঞ্জ জেলা রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সে জমি রেজিস্ট্রি করতে আসা মানুষগুলোর মাঝে কোনো প্রকার স্বস্তি ফেরেনি। কারণ, এখন এখানে বহাল তবিয়তে রয়েছেন দুর্নীতিবাজ খ্যাত রফিকুল ইসলাম ও কলিমুল্লাহ গং।
আমরা সাধারণ মানুষ চাই, একটু দুর্নীতিমুক্ত নারায়ণগঞ্জ জেলা রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্স। আর এই দুর্নীতিমুক্ত কমপ্লেক্স গড়তে রফিকুল ইসলাম ও কলিমুল্লাহ গং-এর মতো অপরাধীদের দোসরদের এখান থেকে দ্রুত অপসারণ প্রয়োজন। এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক ও জেলা পুলিশ সুপারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন দলিল রেজিস্ট্রি করতে আসা সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ।